রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ, রুগ্‌ণ বা অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি ও অবকাঠামো সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এর আগে একই ধরনের আরও দুটি বৈঠক করেন।

আজকের বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির; প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বা বাসস জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি রাজনৈতিক সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ তৈরি করা। একা সরকারের পক্ষে এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, আসুন, আমরা সবাই মিলে পরিবর্তন আনি। সমস্যা আছে, চ্যালেঞ্জও আছে। কিন্তু আমরা এটাও উপলব্ধি করেছি যে সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এসব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।’

সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাঁচ সংস্থার চেয়ারম্যানরা তাঁদের কারখানাগুলোর চিত্র তুলে ধরেন বৈঠকে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) এবং বাংলাদেশ ইস্পাত শিল্প করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশন (বিটিএমসি)।

শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে আজকের বৈঠকে অংশ নেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, কাজী ফার্মসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী জাহেদুল হাসান, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান ও হেড অব ট্রান্সফরমেশন যারেফ আয়াত হোসেন, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের এমডি তামারা হাসান আবেদ, নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি মো. আমিনুল ইসলাম, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সিইও পারভেজ সাইফুল ইসলাম, এসিআইয়ের এমডি আরিফ দৌলা, আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপের চেয়ারম্যান এস কে শামীম উদ্দিন প্রমুখ। বৈঠকে জাপানের মারুবেনি করপোরেশন, টয়োটা সুশো করপোরেশন, সুমিতোমো করপোরেশন, এমইউএফজি ব্যাংক লিমিটেড, মিতসুই অ্যান্ড কো. (এশিয়া প্যাসিফিক) পিটিই লিমিটেড, সোজিৎস এশিয়া পিটিই লিমিটেড, জেট্রো বাংলাদেশ কার্যালয় এবং বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ওয়ালটন, রানার ও টি কে গ্রুপের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন।

বৈঠকে বিজেএমসি জানিয়েছে, ২৫ কারখানার বেশির ভাগ মিল উৎপাদন কার্যক্রম থেকে সরে এসে ইজারা, হস্তান্তর বা নতুন বিনিয়োগের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ সম্ভাবনার দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ঢাকার ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস ও করিম জুট মিলসকে। বিটিএমসি ১৬টি কারখানাকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে দিনাজপুর টেক্সটাইল মিল, টাঙ্গাইল কটন মিল ও আরমিন টেক্সটাইলসের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে বৈঠকে।

বিসিআইসি সংস্থাটির কয়েকটি বন্ধ বা অকার্যকর কারখানার জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্সকে (সিসিসি) বিনিয়োগের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

বিএসএফআইসির অধীনে চিনিকলের বিশাল জমি ও অবকাঠামোকে নতুন বিনিয়োগের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ ও পাবনা চিনিকলে বিভিন্ন ধরনের শিল্প সম্ভাবনার কথা জানানো হয়।

বিএসইসির অধীন প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, জেমকো ও এটলাস বাংলাদেশ এবং বগুড়ায় একটি নতুন স্টিল মিল প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগের কথা তুলে ধরা হয় বৈঠকে। এর মধ্যে বগুড়ায় ১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ইস্পাত কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। এটি চালু হলে বছরে ৩ লাখ টন রড উৎপাদন সম্ভব হবে। আর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজের জায়গায় অটোমোবাইল হাব ও বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা জানায় বিএসইসি।

বৈঠকের বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষি, হালকা প্রকৌশল শিল্পে বিপ্লব চান। পাঁচ সংস্থার আওতায় কিছু কারখানা চালু, কিছু আংশিক চালু এবং কিছু বন্ধ ও রুগ্‌ণ। তারা জানিয়েছে যে কোথাও আমাদের কোনো বিনিয়োগের আগ্রহ আছে কি না। কয়েকটি কারখানা আমরা নিয়েছি। আরও নিতে চাই।’

ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই যে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং সব ধরনের নীতিসহায়তা দিতে চাইছেন, তা খুবই উৎসাহজনক। বন্ধ এবং রুগ্ণ কারখানাগুলো চালু হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, রপ্তানি বাড়বে এবং দেশের উন্নতি হবে। প্রধানমন্ত্রী শুধু যে কৃষি খাতের বিনিয়োগের ব্যাপারে কথা বলেছেন তা নয়; ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, বৈদ্যুতিক গাড়িসহ যেকোনো খাতে বিনিয়োগ করতে চাইলে তাতে সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন। আমরা খুবই আশাবাদী যে প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের উদ্যোগ দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে।’

স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সিইও পারভেজ সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়েছে, সরকারি বিভিন্ন করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বন্ধ ও লোকসানি কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য এসব কারখানা দীর্ঘ মেয়াদে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে চায় সরকার। বেসরকারি খাত আগ্রহী হলে সরকারের পক্ষ থেকে এসব কারখানা চালু করতে নানা সহায়তা দেওয়া হবে।’

ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের এমডি তামারা হাসান আবেদ বলেন, ‘আমরা তেল ও চিনির ব্যাপারে আগ্রহী। এ ব্যাপারে সরকারকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেব।’

নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি ও সিইও মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কোথায়, কার, কী সম্ভাবনা ও সুযোগ আছে, তা বৈঠকে জানানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সর্বোচ্চ নীতিসহায়তা দেওয়া হবে। কর্মসংস্থান তৈরি সরকার বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছেন। সেটি খুবই ভালো উদ্যোগ। তারই অংশ হিসেবে সেতাবগঞ্জ চিনিকল ও রাজশাহী চিনিকলের ব্যাপারে আমাদের আগ্রহের কথা বৈঠকে জানিয়েছি।’

আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপের চেয়ারম্যান এস কে শামীম উদ্দিন বলেন, ‘যেসব সংস্থার আওতায় কারখানাগুলো আছে, সেগুলোর সর্বশেষ অবস্থা আমাদের জানানো হয়েছে, যাতে আমাদের কার কী সুযোগ আছে, তা কাজে লাগাতে পারি।’