সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আগেই বিজেপি চাইছে, লোকসভায় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আদায় করতে। প্রথমে তৃণমূল কংগ্রেস ও পরে শিবসেনার উদ্ধব গোষ্ঠীতে ভাঙন ধরানো সেই চেষ্টারই অংশ।

নরেন্দ্র মোদির সরকার চায়, যত দ্রুত সম্ভব সংসদের বহর বাড়িয়ে নতুন আকারে নারী সংরক্ষণ বিল ও ‘এক দেশ এক ভোট’ বিল দুটি পাস করাতে, যাতে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোট জিততে তাদের অসুবিধায় পড়তে না হয়। সেই লক্ষ্য পূরণে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা জরুরি। না হলে কোনো সংবিধান সংশোধন বিলই পাস করানো যাবে না।

ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধন করার জন্য দুই কক্ষেই দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আবশ্যিক।

লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ২৯। এর মধ্যে একটি আসনে ভোট গ্রহণ স্থগিত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটে তৃণমূলকে পর্যুদস্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই বিজেপি নজর দেয় লোকসভার সদস্যদের কাছে টানার। ২০ জনকে কাছে টেনে তারা তৃণমূল সংসদীয় দলে ভাঙন ধরিয়েছে।

.

তৃণমূলত্যাগী সংসদ সদস্যরা অজানা–অনামী ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া বা এনসিপিআইয়ে যোগ দিয়েছেন। ওই দল ত্রিপুরায় ভোটে দাঁড়িয়েছিল। জামানতও খুইয়েছিল। কস্মিনকালেও কেউ তাদের নাম শোনেনি। তৃণমূলের বিদ্রোহীরা তাতে যোগ দেওয়ার পর এটুকু জানা যায়, বিজেপির উদ্যোগেই দলটির জন্ম।

সেই দলে ২০ জন বিদ্রোহী যোগ দিয়ে স্পিকার ওম বিড়লাকে জানিয়েছেন, তাঁরাই আসল তৃণমূল কংগ্রেস। তাঁরা নতুন দলে যোগ দিচ্ছেন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা করবেন বলে।

তৃণমূল কংগ্রেস ওই ভাঙনের বিরোধিতা করেছে। দলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, ওই ভাঙন অবৈধ। কোনো দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার অধিকার একমাত্র দলেরই থাকে। দলছুটদের নয়। সুপ্রিম কোর্টের রায়েই তা স্পষ্ট। কাজেই দলবিরোধী কাজের জন্য ওই ২০ জনের লোকসভার সদস্যপদ খারিজ করা হোক।

স্পিকার এখনো তাঁর রুলিং দেননি। ২০ জনের দলত্যাগ ও অন্য দলে যোগ দেওয়াকে বিজেপির স্পিকার মান্যতা দেবেন না—এমন আশা করা অন্যায়। বর্ষাকালীন অধিবেশনের শুরুতেই সেই মান্যতা তিনি দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তৃণমূল এই ভাঙনের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হবেই। কাজেই ভাঙন বৈধ না অবৈধ—তা নির্ভর করবে আদালতের ওপর।

.

তৃণমূলের মতো একইভাবে বিজেপি ভাঙন ধরিয়েছে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনাতেও। মহারাষ্ট্রের ওই দলের ৯ জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে ৬ জনকে বিজেপি ভাঙিয়ে নিয়েছে। তাঁরা শিন্ডেপন্থী শিবসেনায় যোগ দিতে চলেছেন। শিন্ডেপন্থীরা বিজেপির মিত্র।

রাজনৈতিক জল্পনা, বিজেপি এবার নজর দিচ্ছে উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টির ওপর। অখিলেশ যাদবের এই দলে লোকসভার মোট সদস্যসংখ্যা ৩৭। দুই–তৃতীয়াংশ দখল করতে গেলে বিজেপির প্রয়োজন ২৬ জনকে ভাঙানো। পারবে কি পারবে না, সেই জল্পনা এখন শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির এক নেতার কথায়, ‘নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর অসাধ্য কিছু নেই। ঠিক সময়ে কাজ হাসিল হবে।’

লোকসভায় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কোনো দলে ভাঙন ধরানোও বিজেপির কাছে ইদানীং সহজ বলে মনে হচ্ছে। কিছুকাল আগেও দলত্যাগের প্রধান মোহ ছিল অর্থ ও পদ। মোদি জমানায় সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়। ভয় ইডির। ভয় সিবিআইয়ের। ভয় জেলে যাওয়ার।

দুর্নীতির অভিযোগ থাকা জনপ্রতিনিধিধের কীভাবে দলে টেনে তদন্ত ও জেলের বাইরে মুক্ত জীবনে ধরে রাখা হয়েছে, তার নমুনা অগুন্তি। বিরোধীরা বিজেপির নাম দিয়েছে ‘ওয়াশিং মেশিন’। মারাত্মক ধরনের অভিযোগ থাকা বিরোধীরাও বিজেপিতে যোগ দিয়ে ভয়মুক্ত জীবন কাটাচ্ছেন। এমন একাধিক দলত্যাগীকে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী করেছে, উপমুখ্যমন্ত্রিত্ব দিয়েছে ও মন্ত্রীও করেছে।

তৃণমূল কংগ্রেস ও উদ্ধবপন্থী শিবসেনা সদস্যদেরও বিদ্রোহ এবং দলত্যাগে উসকানি দেওয়া হয়েছে ওইভাবে। দলত্যাগীদের কারও বিরুদ্ধে কোনো রকম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো শোনা যাচ্ছে, মন্ত্রিসভার রদবদলের সময় এঁদের কারও কারও ঠাঁইও হতে পারে।

.

কিন্তু এভাবেও লোকসভায় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন।

লোকসভার মোট আসন ৫৪৩। ৩টি আসন খালি থাকায় আসনসংখ্যা এই মুহূর্তে ৫৪০। দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অর্থ বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে ৩৬০ সদস্যের সমর্থন আদায় করতে হবে। এনডিএর মোট সদস্য এই মুহূর্তে ২৯৩। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ ও উদ্ধবপন্থী শিবসেনার ছয়জনকে ধরলে সংখ্যাটা হয় ৩১৯। এর পরও দরকার আরও ৪১ জনের সমর্থন।

সেই সমর্থন পেতে বিজেপি ভরসা করছে তামিলনাড়ুর সাবেক শাসক দল ডিএমকের ওপর। নির্বাচনের আগে ডিএমকে ছিল কংগ্রেসের জোটসঙ্গী। সেই সঙ্গে ইন্ডিয়া জোটেরও অন্যতম প্রধান শরিক। কিন্তু ভোটে তাদের ভরাডুবি ও নতুন দল হিসেবে টিভিকের বাজিমাত সব সমীকরণ পাল্টে দেয়।

.

সরকার গড়তে বিজেপি উদ্যোগী হয় ডিএমকে ও এডিএমকেকে কাছাকাছি আনতে। এডিএমকের শরিক বিজেপির সেই উদ্যোগে পানি ফেলে দেয় কংগ্রেস, মুসলিম লিগ ও বামপন্থীরা। বিজেপিকে রুখতে ডিএমকের হাত ছেড়ে তারা নতুন দল টিভিকেকে সরকার গড়তে সাহায্য করে। সরকারের শরিকও হয় তারা সবাই। এতে ডিএমকে–কংগ্রেস সম্পর্কে চিড় ধরে। ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে এম কে স্ট্যালিন অনুপস্থিত থাকেন।

স্ট্যালিনের এই অসন্তোষকেই বিজেপি কাজে লাগাতে চাইছে। তাদের নজরে রয়েছে লোকসভায় ডিএমকের ২২ আসন।

ডিএমকে নেতা স্ট্যালিন নারী সংরক্ষণ বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। সংসদে পাস না হওয়া সেই বিলের লক্ষ্য ছিল, লোকসভায় প্রতি রাজ্যের আসনসংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে মোট আসন ৮১৬ করা। প্রস্তাব ছিল, বাড়তি ওই ২৭২ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা। ইন্ডিয়া জোটের তীব্র বিরোধিতায় সেই বিল দুই কক্ষেই মুখ থুবড়ে পড়ে।

.

মোদি সরকার এখন চাইছে, ওই বিলে একটু অদল–বদল ঘটিয়ে বর্ষাকালীন অধিবেশনে পেশ করা। সে জন্যই বিরোধী দল ভাঙানোয় তাদের এত গরজ।

কিন্তু তাতে কি স্ট্যালিন রাজি হবেন? এটাই মোক্ষম প্রশ্ন। জনগণনার ভিত্তিতে সংসদের আসন বৃদ্ধির ফর্মুলার বিরোধিতা তিনি বরাবর করে এসেছেন। কারণ, তাতে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর তুলনায় উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজ্যগুলোর আসনসংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে। এতটাই যে হিন্দি বলয়ের কর্তৃত্ববাদী দল দাক্ষিণাত্যের সাহায্য ছাড়াই কেন্দ্র সরকার গড়তে পারবে।

এর বিরোধিতায় স্ট্যালিন গত বছর যে সম্মেলন করেছিলেন, তাতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, আগামী আরও ৩০ বছর লোকসভার আসন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা হোক এবং ওই সময়ের মধ্যে চেষ্টা করা হোক গোবলয়ের রাজ্যগুলোতে জন্মহার কমিয়ে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সমতুল্য করার।

সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বিজেপির ছক মেনে মোদি সরকারকে স্ট্যালিন সমর্থন দেন কি না—সেটাই এই মুহূর্তের বড় আগ্রহ। বিশেষ করে প্রথমে রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টি ও এখন লোকসভায় তৃণমূল এবং উদ্ধবপন্থী শিবসেনায় ভাঙন ধরানোয় বিজেপি যখন সফল।

সমাজবাদী পার্টিতে বিজেপি দুই–তৃতীয়াংশ ভাঙন ধরাতে পারবে কি না, সেটাও আরেক বড় প্রশ্ন। যদি তা পারেও; অর্থাৎ ২৬ জন ভেঙে বেরিয়ে আসেন, তাহলেও এনডিএর সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে ৩৪৫। দুই–তৃতীয়াংশ সমর্থন পেতে প্রয়োজন হবে আরও ১৫ জনের। রাজ্যের স্বার্থ ত্যাগ করে এতকাল বিরোধিতা করে আসা স্ট্যালিন বিজেপির লক্ষ্যপূরণে হাত বাড়িয়ে নিজেকে কি ভিলেনের জায়গায় দাঁড় করাবেন? উত্তর এখনো অজানা।

.

রাজ্যসভার ছবিটা অবশ্য লোকসভার চেয়ে অনেক উজ্জ্বল। ২৪৫ সদস্যের এই উচ্চকক্ষে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অর্থ ১৬৪ জনের সমর্থন। গত ২৪ এপ্রিল আম আদমি পার্টির (এএপি) ৭ জনকে ভাঙানো এবং ১৮ জুন রাজ্যসভার নির্বাচনের পর এনডিএর আসন এখন ১৫২। তৃণমূল কংগ্রেসের ৩ সংসদ সদস্য ইস্তফা দিয়েছেন। সেই আসনগুলোতে ভোট হলে বিজেপিই জিতবে। সে ক্ষেত্রে তাদের আসন দাঁড়াবে ১৫৫। দুই–তৃতীয়াংশ পেতে বাকি থাকছে আর মাত্র ৯ জনের সমর্থন।

আরএসএসের নীতি ‘সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ’ কার্যকর করে বিজেপি উঠেপড়ে লেগেছে সংসদের দুই কক্ষেই দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আদায় করতে। একমাত্র তাহলেই তারা পারবে সংসদের আসন বৃদ্ধি করতে। একবার ওই লক্ষ্য পূরণ হলে বাকি থাকবে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনী আসনগুলোর পুনর্বিন্যাস।

যেভাবে আসনগুলোর সীমানা পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ করে জম্মু–কাশ্মীর ও আসামে বিজেপি তাদের কর্তৃত্ব কায়েম করেছে, সেইভাবে এলাকা পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে গোটা দেশেই তারা নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে। ‘এক দেশ এক ভোট’ নীতি কার্যকর করে একই সঙ্গে কেন্দ্র ও অধিকাংশ রাজ্যে ক্ষমতা দখল তখন সহজতর হয়ে দাঁড়াবে। ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে হটানো তখন হয়ে যাবে আরও কঠিন।

মোদির এই লক্ষ্য পূরণের পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা একজনই। ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিন। কী করবেন তিনি, সবার নজর সেদিকেই।