ইটের পর ইট গেঁথে মানুষ গড়ে তুলেছে আধুনিক শহর। কিন্তু এই কংক্রিটের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বুকভরে শ্বাস নেওয়ার মতো সবুজ প্রকৃতি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং তীব্র নগরায়ণের ফলে বিশ্বের বড় শহরগুলো এখন ক্রমেই উত্তপ্ত ও ধূসর হয়ে উঠছে। গাছপালা ও সবুজ জায়গার অভাবে শহরের তাপমাত্রা দিন দিন বাড়ছে, যা পরিবেশের ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করছে।

এই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কৃত্রিম উপায়ে দ্রুত বন তৈরির এক জাপানি পদ্ধতি এখন বিশ্বজুড়ে সবার নজর কেড়েছে। মিয়াওয়াকি নামের এই বিশেষ পদ্ধতিতে খুব ছোট জায়গায় অত্যন্ত ঘন ও দেশীয় প্রজাতির বনাঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে, যা মাত্র কয়েক বছরেই এক একটি মিনি ক্ষুদ্র অরণ্যে পরিণত হচ্ছে। জাপানের টোকিও থেকে শুরু করে বড় বড় অনেক শহরে এই পদ্ধতি এখন শহরে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার এক বড় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

মে মাসে বাংলাদেশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে নগর বনায়ন শুরু করেছে, যা শহরের দূষণ কমাতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই পরিবেশবান্ধব গল্পের শুরু জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরো মিয়াওয়াকির হাত ধরে। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল পটেনশিয়াল ন্যাচারাল ভেজিটেশন। কাজের সময় মিয়াওয়াকি লক্ষ করেন, আধুনিক নগরায়ণের ফলে আদিম ও দেশীয় বনাঞ্চল হারিয়ে যাচ্ছে এবং তার জায়গায় মানুষ কেবল শোভাবর্ধনকারী বা একজাতীয় গাছের বাগান তৈরি করছে। কোনো অঞ্চলের আদি বা স্থানীয় গাছপালা নিয়ে প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার করা এখন আসল চ্যালেঞ্জ।

২০০৪ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি গবেষণাপত্রে তিনি এই আদিম বনাঞ্চল ফিরিয়ে আনাকে আধুনিক যুগের অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর পদ্ধতিতে স্থানীয় প্রজাতির গাছ নির্বাচন, মাটির গুণ উন্নত করা এবং অত্যন্ত ঘনভাবে চারা রোপণ করা হয়, যাতে গাছগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে খুব দ্রুত বড় হতে পারে। আজ এই পদ্ধতি জাপান ছাড়িয়ে ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ বনায়ন পদ্ধতিতে যেখানে একটি গাছ থেকে আরেকটি গাছ কয়েক মিটার দূরে রোপণ করা হয়, সেখানে মিয়াওয়াকি অরণ্য দেখতে বেশ ঠাসাঠাসি বা ঘন মনে হয়। এই পদ্ধতিতে প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ৩ থেকে ৫টি চারা গাছ খুব কাছাকাছি রোপণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য কোনো কৃত্রিম সৌন্দর্য তৈরি করা নয়, একটি নিখুঁত প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম পুনর্নির্মাণ করা।

রোপণের পর ঘন বিন্যাসের কারণে সূর্যালোক পাওয়ার আশায় গাছগুলোর মধ্যে ওপরের দিকে ওঠার তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে গাছগুলো সাধারণের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ দ্রুত ও সোজা ওপরের দিকে বা উল্লম্বভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে মাটির নিচে তাদের শিকড়গুলো একটি শক্তিশালী জালের মতো তৈরি করে। এই বনের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্তরবিন্যাস। এখানে একদম ছোট গুল্মজাতীয় গাছ থেকে শুরু করে মাঝারি এবং বিশালাকার ক্যানোপি—সব ধরনের গাছ একসঙ্গে বড় হয়। এর ফলে প্রাকৃতিকভাবে একটি বন তৈরি হতে যেখানে শত বছর লেগে যেত, মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে মাত্র দুই–তিন দশকের মধ্যেই সেই স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন শহর এখন আরবান হিট আইল্যান্ডের সমস্যায় জর্জরিত। শহরের পিচঢালা রাস্তা ও বহুতল ভবন দিনের বেলা সূর্যের তাপ শোষণ করে এবং রাতে তা ধীরে ধীরে বাতাসে ছাড়ে। এর ফলে গ্রামের তুলনায় শহরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। শহরের পরিকল্পনাবিদদের কাছে মিয়াওয়াকি অরণ্য আশীর্বাদের মতো, কারণ এটি তৈরি করতে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না। শহরের পরিত্যক্ত কোনো প্লট, কারখানার খালি জায়গা, রাস্তার ধার কিংবা পুরোনো ময়লা ফেলার ভাগাড়কেও এই ঘন সবুজ বনে রূপান্তর করা সম্ভব। যেখানে বড় কোনো পার্ক তৈরির জায়গা নেই, সেখানে এই ক্ষুদ্র অরণ্যগুলো শহরের তাপমাত্রা কমাতে এবং দূষিত বাতাস পরিশোধন করতে দারুণ ভূমিকা রাখছে।

নেদারল্যান্ডসে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো মিয়াওয়াকি নীতি অনুসরণ করে অসংখ্য ছোট ছোট বন তৈরি করেছে, যা স্কুল এবং বিভিন্ন সামাজিক কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও যুক্তরাজ্যেও শহুরে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত শহর যারা ইতিমধ্যেই তাদের সবুজায়নের জন্য বিখ্যাত, তারাও তাদের জীববৈচিত্র্য বাড়াতে মিয়াওয়াকির নীতি কাজে লাগাচ্ছে। এমনকি লাতিন আমেরিকার স্থানীয় সরকারগুলো তীব্র তাপপ্রবাহের হাত থেকে শহরকে বাঁচাতে এই জলবায়ু অভিযোজন কৌশল বেছে নিয়েছে।

কার্বন শোষণের পাশাপাশি এই ঘন বনগুলো শহরের বুকে হারিয়ে যাওয়া পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি এবং ছোট ছোট কীটপতঙ্গকে পুনরায় ফিরে আসার জন্য নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করে দিচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই মাইক্রোফরেস্টগুলো কখনোই আদি বা বিশাল প্রাকৃতিক বনের বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু শহরের পরিত্যক্ত ও অবহেলিত জায়গাকে একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে এটি একুশ শতকের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী পরিবেশগত পরীক্ষা।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া