পাকা সড়ক থেকে নেমে কিছুদূর মেঠো পথ। এরপর আলপথ ধরে সামান্য এগোতেই চোখজুড়ানো সবুজ বাগান। সেখানে সারি সারি গাছ। মাথার ওপর বাঁশের মাচায় সবুজ পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ঝুলছে বেগুনি, কালো, সবুজ ও লালচে রঙের আঙুর। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ভিড় করছেন এই আঙুরবাগান দেখতে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ বাগানমালিকের কাছে আঙুর চাষের পদ্ধতি জানতে চাইছেন। আবার কেউ বাগান থেকে কলম করা চারা সংগ্রহ করে নিজেরাও আঙুর চাষে ঝুঁকছেন।
দেশের মাটিতে বিদেশি আঙুর চাষ করে সফল হয়েছেন বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছি গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলাম নাহিদ (৩৩)। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ পাস করা মিনহাজুল প্রথমে একটি বেসরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে ১০ বছর চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ২০২৪ সালে বিদেশি ভারত সুন্দরী জাতের বরই চাষের মাধ্যমে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। এরপর একে একে বিদেশি পেয়ারা, ড্রাগন, স্ট্রবেরি ও আনার চাষ করেন। এক বছর আগে শুরু করেন বিদেশি আঙুর চাষ। বর্তমানে মিনহাজুল ইসলামের ১৫ শতাংশ আয়তনের বাগানে শোভা পাচ্ছে বাইকুনুর, গ্রিন লন, ব্ল্যাক ম্যাজিক, জয়শ্রী প্লেস ও দিকশন জাতের থোকা থোকা আঙুর।
মিনহাজুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি আঙুর ৩৭০ টাকা দরে বাগান থেকে বিক্রি হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন। এতে খরচ ওঠার পরও অন্তত চার লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন। আঙুরের পাশাপাশি বাগান থেকে কলম করা চারা বিক্রি করে পেয়েছেন তিন লাখ টাকা। প্রতিটি চারা বিক্রি করেছেন ৩০০ টাকায়। অনেকেই বাগান থেকে চারা সংগ্রহ করে আঙুর চাষে ঝুঁকেছেন।
.চাকরি ছেড়ে সফল কৃষি উদ্যোক্তা
মিনহাজুল ইসলামের জন্ম ও শৈশব কেটেছে গ্রামে। বাড়ির পাশে সরু গ্রাম উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন বগুড়া পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখান থেকে এইচএসসি পাসের পর উত্তরা ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে বিবিএ পাস করেন।
২০১৪ সালে একটি ওষুধ কোম্পানিতে সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মিনহাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই চাকরিটা ছিল অনেক পরিশ্রমের। বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মানসিক চাপ ছিল। কর্মঘণ্টা ছিল দিনরাত। এর পরও টানা ১০ বছর চাকরি করেছি। সারা দিন মার্কেটে কাজ করে এসে রাতে মুঠোফোনে ইউটিউব দেখতাম। ইউটিউবে বিদেশি বরই চাষের পদ্ধতি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই প্রায় দুই বছর আগে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসে বরই চাষ শুরু করি। শুরুতে পারিবারিক সাড়ে চার বিঘা জমিতে ভরতসুন্দরী বরই চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পাই। ৩ লাখ টাকা খরচ করে ২০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করি।’
.সে–ই শুরু; আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে ড্রাগন, স্ট্রবেরি, পেয়ারা, বিদেশি আঙুর এবং বেদনা চাষ শুরু করেন মিনহাজুল। এখন তাঁর বিশাল বাগানজুড়ে হরেক বিদেশি ফল। মিনহাজুল ইসলামের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আশপাশের অনেক শিক্ষিত বেকার তরুণ বিদেশি ফল চাষে ঝুঁকেছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্যোক্তারা এসে তাঁর বাগান থেকে কলম চারা সংগ্রহ করছেন।
মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘চাকরি ছেড়ে গ্রামে এসে বিদেশি ফল চাষ করা দেখে অনেকেই হাসাহাসি করেছেন; কিন্তু মানুষের কথায় পাত্তা দিইনি। মনোবল হারাইনি। বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা, কঠোর পরিশ্রম এবং আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই একসময় বরই চাষে সফলতা পেয়েছি।’
.মনোলোভা এক ফলের বাগান
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার অদূরে গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বাজার। সেখান থেকে বাগবাড়ী-ধুনট সড়ক ধরে আরও চার কিলোমিটার পেরিয়ে নিমগাছি গ্রামে মিনহাজুল ইসলামের মনোলোভা ফল বাগানের অবস্থান।
গত ১৭ মে সরেজমিনে দেখা যায়, এক পাশে বাগানের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে টসটসে আঙুর। আরেক পাশে ড্রাগন, পেয়ারা, স্ট্রবেরি ও বেদনার বাগান। আঙুরের বাগান ঢেকে দেওয়া হয়েছে জাল দিয়ে। ভেতরে পরিচর্যা করছিলেন উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলাম। মাথার ওপর বাঁশের মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে লম্বাটে ও গোলাকার নানা জাতের আঙুর। লতানো গাছের প্রতিটিতেই লাল, সবুজ আঙুরের সমাহার। অধিকাংশ ফল পরিপক্ব। বাগানজুড়ে উঁচু করে মাচা তৈরি করা হয়েছে, যার ওপর নাইলনের সুতা টানানো। সেই সুতায় ভর করে ছড়িয়ে পড়েছে আঙুরলতা।
.প্রকৌশলী থেকে আঙুরচাষি, এক বছরেই আয় ৩৬ লাখ টাকা.মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ইউটিউবে আঙুর চাষের পদ্ধতি দেখে গত বছরের মে মাসে রাজশাহীর একটি নার্সারি থেকে বিদেশি জাতের আঙুরের ৯৪টি চারা সংগ্রহ করেন। ৪০০ টাকা দরে কেনা এসব চারা বাগান পর্যন্ত নিতে খরচ হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। এরপর নিজেই বাগান তৈরি করে চারা রোপণ করেন। পাখি ও কীটপতঙ্গ যাতে আঙুর খেতে না পারে, এ জন্য বাগানের ওপরে নেট দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ১৫ শতকের আঙুর বাগানে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে বাগানের গাছজুড়ে থোকা থোকা আঙুর ঝুলতে থাকে।
আঙুর চুরি ঠেকাতে বাগানের এক পাশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন মিনহাজুল। কেউ বাগানে প্রবেশ করলে এই ক্যামেরা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা জানিয়ে দিচ্ছে।
ধুনট উপজেলার নিমগাছি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সপ্তাহে দুই দিন বাগান পরিদর্শন করে রোগবালাই দমন ও কৃষি পরামর্শ দিয়েছি। লাভজনক হওয়ায় কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের আঙুর চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
.‘কয়েকটা আঙুর মুখে দিয়েছি, খুবই মিষ্টি’
বাগানের প্রতিটি গাছের যত্ন নেন মিনহাজুল ইসলাম নিজেই। সঠিক ছাঁটাই, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক পরিচর্যার বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপসহকারী কর্মকর্তারা পরামর্শ দেন। আঙুর চাষে রাসায়নিক সারের ব্যবহার খুবই কম। মূলত জৈব সার, গোবর ও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করা হয়েছে উল্লেখ করে মিনহাজুল ইসলাম বলেন, এতে ফলের স্বাদ ভালো থাকে এবং উৎপাদন খরচও কম। নিয়মিত ছাঁটাই, লতা বেঁধে দেওয়া এবং সঠিক সেচ ব্যবস্থাপনা আঙুর চাষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বৃষ্টিতে ফলের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, এ জন্য বাড়তি যত্ন নিতে হয়েছে।
.শেরপুর উপজেলা থেকে বাগান দেখতে এসেছেন কলেজছাত্র ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে আঙুরবাগানের ছবি দেখে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। এখানে এসে বিস্মিত হয়েছি। মাচাজুড়ে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকায় থোকায় আঙুর ঝুলছে, সত্যিই দেখার মতো। বাগান থেকে কয়েকটা আঙুর মুখে দিয়েছি, খুবই মিষ্টি। এ বাগান থেকে কয়েকটা কলম চারা নিয়ে বাড়ির আঙিনায় আঙুরের চাষ করব।’
.গাছে থোকায় থোকায় আঙুর, সমৃদ্ধির পথ পেয়ে গেছেন কৃষক জাহাঙ্গীর.সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশে আঙুর চাষ বাড়বে উল্লেখ করে মিনহাজুল ইসলাম বলেন, আঙ্গুর চাষের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া অনুপযোগী। কারণ বৃষ্টিতে আঙুর খেত নষ্ট হয়। এ কারণে দরকার পলি হাউজ। যেসব এলাকায় আঙুর চাষাবাদ হচ্ছে সেসব এলাকায় সরকারি উদ্যোগে পলি হাউজ নির্মাণ করলে লাভজনক এ ফল চাষে আরও বেশি উদ্যোক্তারা ঝুঁকবে। আঙুর আমদানি নির্ভরতা কমবে। তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই আমার কাছ থেকে চারা নিয়ে চাষ শুরু করেছেন। আমি চাই, দেশে ঘরে ঘরে আঙুরের চাষ হোক-বিদেশ থেকে যেন আর আঙুর আমদানি করতে না হয়।’
ধুনট উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সোহেল রানা বলেন, মিনহাজুল প্রথম বছরেই আঙুর চাষে বাজিমাত করেছেন। বিদেশি ফল চাষে চাষিদের উৎসাহিত করতে এখানে তৃণমূল কৃষক সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ডিজিটাল মাধ্যমে কৃষি পরামর্শ গ্রহণের জন্য ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও স্ক্যানার দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ফল চাষে উৎসাহিত করতে ইতিমধ্যে উদ্যোক্তা মিনহাজুল ইসলামকে কৃষি প্রণোদনা হিসাবে একটি পাওয়ার টিলার ও একটি শ্যালো ইঞ্জিনসহ সেচ পাম্প দেওয়া হয়েছে।
ধুনটের মাটি ও আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে এই কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, এ বছর এক হেক্টর জমিতে আঙুরের চাষ হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। নতুন ও সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগকে উৎসাহ দিতে কৃষি বিভাগ সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা করছে।






