মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের বিশৃঙ্খলা এবং তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বের দুই শীর্ষ শক্তির নেতা চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বৈঠক করলেন। সবাই ভেবেছিলেন, এই সংবেদনশীল বিষয়গুলোই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং পরিবর্তে প্রাচীন গ্রিসের এক যুদ্ধের কথা তুলে ধরলেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে সি চিন পিং খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ সালে এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে শুরু পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্দেশ করে তিনি জানতে চান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা থুসিডাইডিস ফাঁদ এড়িয়ে পরাশক্তিগুলোর সম্পর্কে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে?
থুসিডাইডিস ট্র্যাপ কী
ট্রাম্পের সাবেক প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননসহ পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের আলোচনায় প্রায়ই ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’ শব্দবন্ধটি ঘুরেফিরে আসে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, যখন কোনো উদীয়মান শক্তি কোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে হটিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, তখন প্রায়ই তার পরিণতি হয় যুদ্ধ।
প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস তাঁর ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেশিয়ান ওয়ার’ বইয়ে লিখেছিলেন, ‘এথেন্সের উত্থান এবং এর ফলে স্পার্টার মনে জেঁকে বসা ভয়ই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।’
এথেন্স যেভাবে একসময় স্পার্টার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল, এখানেও ইঙ্গিতটি একই রকম—চীনের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের মনে উদ্বেগ তৈরি করছে এবং দেশটির সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।
পর্যবেক্ষকেরা বলে আসছেন, সি চিন পিং বহু বছর ধরেই এই শব্দ ব্যবহার করে আসছেন। তবে ট্রাম্পের সফরকালে এই ধ্রুপদি তত্ত্বের অবতারণা করার উদ্দেশ্য হতে পারে তাইওয়ান প্রশ্নে তাঁর অবস্থান আগেভাগেই জানান দেওয়া। পরে ট্রাম্পকে সতর্ক করে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, তাইওয়ান নিয়ে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ তাঁদের দুটি দেশকে ‘সংঘাতের’ দিকে ঠেলে দিতে পারে।
চীন স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে। বিষয়টি উল্লেখ করে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
সি চিন পিং বলেন, যদি এটি সামাল দিতে গিয়ে ভুল কিছু করা হয়, তবে দুই দেশ একে অপরের মুখোমুখি হতে পারে, এমনকি সংঘাতে জড়াতে পারে। এমন কিছু ঘটলে, সেটি গোটা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।
তবে গতকাল সন্ধ্যায় আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্ট অবশ্য কিছুটা নরম সুরে কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাদের মধ্যকার আপাত–অনিবার্য এই মতবিরোধ সামাল দিতে সক্ষম।
সি চিন পিং বলেন, ‘চীনা জাতির গৌরবময় পুনরুত্থান এবং আমেরিকাকে আবারও মহান করে তোলা—এই দুটি বিষয় পুরোপুরি একসঙ্গে চলতে পারে...এবং তা গোটা বিশ্বের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে।’
এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, সি চিন পিং ‘খুব মার্জিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত একটি ক্ষয়িষ্ণু বা পতনের দিকে যাওয়া রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন’।
অবশ্য ট্রাম্প দাবি করেন, এটি তাঁর মেয়াদের অধীন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। শুক্রবার ভোরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘দুই বছর আগে, আমরা প্রকৃতপক্ষে একটি ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্র ছিলাম।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের চেয়ে সবচেয়ে চাঙা একটি রাষ্ট্র। আশা করি, চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী ও ভালো হবে!’
সি’র সঙ্গে বৈঠক শেষে চীন ছাড়ছেন ট্রাম্প—প্রাধান্য পেয়েছে ইরান, তাইওয়ান ও বাণিজ্য ইস্যু






