কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে আইস বাথ নিচ্ছিলেন দরিয়েলতন গোমেজ। বরফ জলের ঝাপটায় শরীরের ক্লান্তি কেটে যেতেই তিনি শুরু করলেন বুনো নাচ। একা নয়, সতীর্থদের নিয়ে সেই নাচ ছিল মুক্তির আনন্দ।
এক মৌসুম পর এক ম্যাচ বাকি রেখেই বাংলাদেশ ফুটবল লিগের শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছে বসুন্ধরা কিংস। ক্লান্ত মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে দরিয়েলতন বললেন, “এত ভালো লাগছে যে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।” এই ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের নেপথ্য নায়ক তিনিই। আজকের একটিসহ লিগে তাঁর গোল ১৭টি।
আবাহনীর বিপক্ষে লিগের অঘোষিত ফাইনালে ২-০ গোলে জয়ী হয়েছে কিংস, তাতেই নিশ্চিত হয়েছে মৌসুমের শীর্ষস্থান। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই গ্যালারি থেকে হাজারো দর্শক মাঠে নেমে পড়লেন। ফুটবলারদের ছোঁয়ার চেষ্টা, হাত মেলানো আর ছবি তোলার আবদারে তপু বর্মণরা নাজেহাল হয়ে পড়লেন।
ভিড় ঠেলে দোতলার সাজঘরে পৌঁছে শুরু হলো উৎসব। নাচ-গানের মধ্যে গরম মেটাতে তরমুজ খাওয়া, ডাবের পানিতে গলা ভেজানো। একে অপরকে জড়িয়ে অভিনন্দনের জোয়ারে ভেসে উঠলেন কিংসের ফুটবলাররা।
তবে এই শিরোপা জয়ের পথ কিংসের জন্য সহজ ছিল না। আভিজাত্য আর অর্থের জৌলুসে মোড়া ক্লাবটি পার করেছে নজিরবিহীন সংকট। বেতন বকেয়ার অভিযোগে সেরা ডিফেন্ডার তারিক কাজী দল ছেড়েছেন।
রোমানিয়ান কোচ ও ফিজিওর অভিযোগে ফিফার কঠিন শাস্তির মুখে পড়েছে ক্লাব। বর্তমানে তাদের ওপর দলবদল নিষেধাজ্ঞা। লিগের প্রথম পর্ব শেষে আর্জেন্টাইন কোচ মারিও গোমেজকে বিদায় করা হয়। শেষ তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দুই নাইজেরিয়ান ফুটবলার বেতনের দাবিতে মাঠে নামেননি।
গত এক দশকে দেশের সবচেয়ে পেশাদার ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত কিংসের জন্য এসব বেমানান। শেষ দিকের ম্যাচগুলোতে মাত্র একজন বিদেশি নিয়ে মাঠে নামলেও খেলায় সংকটের ছাপ কম পড়েছে। ফলে আজ লিগ শিরোপা নিশ্চিত।
সাজঘরের উদ্দাম শব্দের মধ্যে কোচ গোলাম জিলানী বললেন, “এই মৌসুমের প্রতিকূলতা ছিল অনেক। প্রথম পর্বের পর হেড কোচ ও ট্রেনার চলে গেলেন, বিদেশি দুজন খেলোয়াড় শেষ দিকে খেলেনি। কিন্তু ছেলেদের ওপর আমাদের বিশ্বাস ছিল। কারণ, ওরা সবাই জাতীয় দলের খেলোয়াড়।” সাফল্যের কৃতিত্ব কাউকে আলাদা করে দিতে চাননি তিনি। তাঁর ভাষায়, “অল প্লেয়ার...প্রত্যেক খেলোয়াড়ই এই দলের জন্য খেলেছে।”
আবাহনীকে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই কিংসের শিরোপা পুনরুদ্ধার। জয়ের নায়ক মিডফিল্ডার সোহেল রানা। তাঁর বাঁ পায়ের দর্শনীয় গোলে জয় নিশ্চিত হয়েছে। তিনি বললেন, “ম্যাচটি আমরা ফাইনাল হিসেবেই নিয়েছিলাম। জয়টা এসেছে শুধু “টিম এফোর্ট” এবং সবার আত্মবিশ্বাসের কারণে।” গোলটি উৎসর্গ করেছেন নবজাতক পুত্রকে।
অধিনায়ক তপু বর্মণ বললেন, “মৌসুমটা আমাদের জন্য অনেক কঠিন ছিল। আজ যদি আবাহনীর কাছে হারতাম, তবে লিগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারত।” শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব উৎসর্গ করেছেন সতীর্থদের।
আক্রমণভাগের রাকিব হোসেন তিন হলুদ কার্ডে খেলেননি, রিমন হোসেন লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞায়। সাদ উদ্দিনকে লেফট ব্যাক হিসেবে খেলতে হয়েছে। এত ‘নাই’র মধ্যেও আবাহনীকে হারিয়ে কিংস প্রমাণ করল, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত সংহতি ও স্থানীয় খেলোয়াড়দের মানসিক শক্তিই শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি।






