হাসপাতালে শয্যার ঘাটতির কারণে মেঝেতে বিছানা পেতে শিশু আবদুল্লাহর চিকিৎসা চলছে। তার মুখে ক্রিম লাগিয়ে দিচ্ছিলেন মা সুমা আক্তার। ছেলের পাশে অসহায় দৃষ্টিতে বসে ছিলেন বাবা সাইফুল ইসলাম। শিশুটির ঠোঁটে ও মুখে হামের ফুসকুড়ি ফেটে ঘা হয়েছে।

কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই আবদুল্লাহর বাবা সাইফুল তাকিয়ে বললেন, ১০ দিন আগে ছেলের জ্বর হয়। দুদিন বাড়িতে ওষুধ খাওয়ানোর পর সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তাড়াতাড়ি ডিএনসিসি হাসপাতালে নিয়ে আসলে জানা যায়, হাম হয়েছে। দুদিন ভর্তির পর অবস্থা খারাপ হলে আইসিইউতে নেওয়া হয়। তিন দিন সেখানে থাকার পরও উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এখানকার চারতলায় চিকিৎসা চলছে।

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ১০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে থাকেন সাইফুল ইসলাম। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান তিনি। তাঁর দুই ছেলে—বড়টি মো. আলিফ (৬ বছর) ও ছোটটি আবদুল্লাহ (১৮ মাস)।

শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সাইফুলের সঙ্গে কথা বলার সময় জানা যায়, বড় ছেলে আলিফও হামের উপসর্গে ডিএনসিসি হাসপাতালে ভর্তি। শাশুড়ি তার দেখাশোনা করছেন। স্ত্রীকে নিয়ে ছোট ছেলের চিকিৎসায় এখানে আছেন তিনি।

ছোট ছেলের অবস্থা ভালো নয় বলে জানান সাইফুল। তিনি বলেন, সারা শরীরে ফুসকুড়ি, ঠোঁট-মুখের অবস্থা খুব খারাপ। ফুসকুড়ি ফেটে ঘা হয়েছে। শ্বাসকষ্টে অক্সিজেন ছাড়া শ্বাস নিতে পারছে না। চিকিৎসকেরা জরুরি আইসিইউ প্রয়োজন জানিয়েছেন। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও জায়গা না পেয়ে মেঝেতে অক্সিজেন লাগিয়ে রেখেছেন।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল বিকেলে আবদুল্লাহর অবস্থা এতই খারাপ ছিল, মনে হচ্ছিল ছেলেটা বুঝি আর নেই। শ্বাস নিতে পারছিল না। আমরা তো কান্নাকাটি শুরু করেছি। ডাক্তারকে জানানোর পর তাড়াতাড়ি করে একটা অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তারপর থেকে অক্সিজেন চলছে।’

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সামর্থ্য নেই বলে তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা বারবার বলছে, অবস্থা বেশি ভালো না, দ্রুত প্রাইভেট হাসপাতালের আইসিইউতে নিতে। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার তো অনেক খরচ। আমি অটোরিকশা চালাই। এত খরচ কীভাবে জোগাড় করব?’

আগামী এক মাস খুবই ক্রিটিক্যাল সময়। ঈদে বাচ্চারা এলাকা পরিবর্তন করবে। এতে সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে।

এফ এ আসমা খান, তত্ত্বাবধায়ক, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

ছোট ছেলের চিকিৎসায় ব্যস্ত হয়ে বড় ছেলের খবরও নিতে পারছেন না সাইফুল। শাশুড়ির কাছ থেকে শুনেছেন, আলিফের অবস্থা কিছুটা ভালো। দুই হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে ক্লান্ত।

পরে বেলা দেড়টায় জরুরি বিভাগের সামনে আবার দেখা হলে তিনি বলেন, ‘আইসিইউতে একটা সিট ফাঁকা হয়েছে। ছোট ছেলেকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অবস্থা বেশি ভালো না। ওনারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। আমরাও অপেক্ষা করছি আর আল্লাহকে ডাকছি।’

শুধু সাইফুলের সন্তান নয়, মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাম ও উপসর্গে ৫০টির বেশি শিশু চিকিৎসাধীন। পাঁচ, ছয় ও সাততলায় তাদের চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যে পাঁচতলায় আইসিইউ ও এইচডিইউ।

দুপুরে ছয়তলার সাধারণ ওয়ার্ডে সারি সারি শয্যায় অসুস্থ শিশু। শয্যাঘাটতিতে মেঝেতেও শুয়ে আছে কয়েকজন। কারও মুখ-গায়ে লালচে ফুসকুড়ি। কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ কাঁদছে। কাউকে নেবুলাইজার দেওয়া হচ্ছে, তাতে আরও কান্না। স্বজনরা শান্ত করার চেষ্টা করছেন, নার্সরা ব্যস্ত।

ছয়তলার বারান্দায় আড়াই মাসের ফারিশ চিকিৎসাধীন। পাশে দাদি জোহরা বেগম (৪৫)। নরসিংদীর রায়পুরা থেকে এসেছেন। তিনটি হাসপাতাল ঘুরে ঢাকায় এসেছেন। জোহরা বলেন, চিকিৎসক জানিয়েছেন নাতির বুকে কফ জমেছে, রক্তে ইনফেকশন। তিন দিন ধরে চিকিৎসা চলছে।

ঢাকার বাইরের শিশুরা বেশি আসছে

তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৭ শিশু ভর্তি। কারও মৃত্যু হয়নি। মোট ৫৪ জন ভর্তি, ১২ জন আইসিইউ-এইচডিইউতে।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫টি শিশু ভর্তি। ৮৮৮ জন সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। ৪০টি উপসর্গে ও ৭টি নিশ্চিত হামে মৃত্যু।

আসমা খান বলেন, সব জেলা থেকে শিশু আসছে, তবে ঢাকার বাইরের বেশি। প্রথম ৩৬ মৃতের মধ্যে ৩০ জন ঢাকার বাইরের।

আগামী এক মাস পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বলে মনে করেন তিনি। ‘এখন পর্যন্ত হাম পরিস্থিতি ওঠানামা করছে। একবার জ্বর, সর্দি ভালো হওয়ার পরে দ্বিতীয় দফায় শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে আগামী এক মাস খুবই ক্রিটিক্যাল সময়। ঈদে বাচ্চারা এলাকা পরিবর্তন করবে। এতে সংক্রমণ আরও বেড়ে যেতে পারে।’