দেশের ১০ হাজার ৭৪০টি স্কুলে খেলার মাঠের অভাব রয়েছে। এতে শিশুরা মুঠোফোনসহ বিভিন্ন ডিভাইসে আসক্ত হচ্ছে এবং সৃজনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে তারা মানসিক বৈকল্য নিয়ে বড় হচ্ছে।

আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের আয়োজনে ‘শিশুর নিরাপদ জীবন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব তথ্য তুলে ধরেন। সংগঠনের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের প্রেসিডিয়াম সদস্য লেনিন চৌধুরী।

এমন একটা শিক্ষাক্রম বানিয়েছি, যেই শিক্ষাক্রমে শিশুদের মানসিক কিংবা অন্যান্য দক্ষতা উন্নয়নের জায়গা রাখা হয়নি। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা হয়নি
ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেনিন চৌধুরীর মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ শিশু। ধর্ষণ, পাচার, মানসিক নির্যাতন, অপুষ্টি ও শিশুশ্রমের মতো বিভিন্ন সংকটে তাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৪ সালে ৪০৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ভয়ভীতি, পারিবারিক লজ্জা, বিয়ে না হওয়ার শঙ্কা, সালিসসহ নানা কারণে অধিকাংশ ঘটনা আড়ালে থেকে যায়। বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনা রিপোর্ট হয় না।

প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে ৯টি মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের শিকার। অনেক মা-বাবা মনে করেন, বকাঝকা, মারধর বা শারীরিক আঘাত ছাড়া শিশু পড়াশোনা করবে না। এছাড়া ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত এবং তারা নিয়মিত শারীরিক আঘাত সহ্য করে। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১৮ শতাংশ অপুষ্টিজনিত গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

সেমিনারে হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে লেনিন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবে সরকারি হিসাবে কয়েক শ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে অর্ধ লক্ষাধিক শিশু। শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের অপরিণামদর্শী, কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের কারণে এ রকম একটি মানবিক বিপর্যয় ঘটে গেল।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া বলেন, ‘শিশুর সঠিক বিকাশ শুধু খাদ্য বা শারীরিক পুষ্টির ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাদ্য শিশুর শরীর গঠন করে। কিন্তু তার মনোজগৎকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন নীতিশিক্ষা এবং সৃজনশীল পরিবেশ।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে শিশু জন্মগ্রহণ করে প্রথমে তার নিরাপদ স্থান হচ্ছে তার মা-বাবা। সে মা-বাবার কথা শোনে, (মা–বাবার) চিন্তা-চেতনা তাকে আকৃষ্ট করে। সে সময় মা-বাবার এমন কিছু বিষয় রাখা উচিত, যা শিশু বিকাশের জন্য সহায়ক হয়। যাতে এগুলো তাকে আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু আমরা সেগুলো দেখি না।’

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, ‘আমরা একটা ধর্মীয় গোঁড়ামি মুক্ত, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত, উগ্রতা মুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ চাই। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনায় লালিত একটা বাংলাদেশ আমরা চাই। সেটা যেন আমরা আমাদের শিশুদের মধ্যে সঞ্চালিত করতে পারি।’ শিশুদের বর্তমান শিক্ষাক্রম বাস্তবতার সঙ্গে অনুপযোগী উল্লেখ করে তা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘এমন একটা শিক্ষাক্রম বানিয়েছি, যেই শিক্ষাক্রমে শিশুদের মানসিক কিংবা অন্যান্য দক্ষতা উন্নয়নের জায়গা রাখা হয়নি। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিশুশিক্ষার জন্য কোনো একটা নীতির জায়গায় আমরা দর্শনগতভাবে একমত হতে পারিনি। বিচিত্র রকমের শিক্ষাদর্শনের মধ্য দিয়ে আমরা শিশুদের বড় করছি।’

সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল কবীর, অধ্যাপক মো. আবু সাঈদ, শিল্পী তামান্না রহমান, সাদিয়া আরমান এবং শিশু প্রতিনিধি আদ্রিতা রায়।