কুমিল্লা নগরের স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের আঙিনায় আজকের সকালটা অন্যান্য দিনের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। আজ শনিবার ছুটির দিন হলেও সাতসকালেই বিদ্যালয় আঙিনায় প্রবেশের আগে দূর থেকেই কানে ভেসে আসছিল শিক্ষার্থীদের কিচিরমিচির শব্দ। সময় তখন সকাল আটটা। শীতের সকাল; চারদিক কুয়াশায় আচ্ছন্ন। কিন্তু এর মধ্যেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খুদে গণিতবিদদের মিলনমেলা বসেছে।
আজ সকাল ১০টায় নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-মুক্তকণ্ঠ গণিত উৎসব ২০২৬’-এর কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বের আনুষ্ঠানিকতা। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। কুমিল্লার এই আঞ্চলিক গণিত উৎসবে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী—এই ছয় জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা আছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার নাগমুদ বাজার উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিন আলম এসেছে নিকটাত্মীয় রিফাত আহমেদের সঙ্গে। ভোর সাড়ে পাঁচটায় রওনা দিয়ে কয়েক ধাপে সিএনজি অটোরিকশাযোগে ভেন্যুতে পৌঁছায় সকাল আটটায়। মাহিন আলম বলে, ‘এর আগেও একবার গণিত উৎসবে অংশগ্রহণ করেছি। আগের অভিজ্ঞতার কারণে আমার এখন গণিতে ভয় লাগে না। আশা করছি ভালো কিছু হবে।’
ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অনামিনা দেবনাথ এসেছে কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহ জামালের সঙ্গে। এখন পর্যন্ত সে দুবার অংশ নিয়েছে গণিত উৎসবে। অনামিনা দেবনাথ বলে, ‘গণিত আমার ভালো লাগে। এই প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক অংশগ্রহণের ফলে কোনো গণিতভীতি কাজ করে না। কুমিল্লার আঞ্চলিক পর্বে উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে চাই।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মুনাওয়ার মিসবাহ বাবা-মায়ের সঙ্গে এসেছে। বাবা এম এম রহমান মুর্শেদ বলেন, ‘আমাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। সেখান থেকে সকালে রওনা দিয়ে এসেছি।’ মো. মুনাওয়ার মিসবাহ বলে, ‘প্রথমবারের মতো এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছি। আমি খুবই উচ্ছ্বসিত।’
আয়োজকেরা জানান, সকাল ১০টার দিকে নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে গণিত উৎসবের শুরু হয়। একই সঙ্গে উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা। পরে ওড়ানো হয় বেলুন।
‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’স্লোগানে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও মুক্তকণ্ঠের ব্যবস্থাপনায় ২৪তম বারের মতো এই গণিত উৎসবের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি। এ বছর দেশের ১২টি শহরে আঞ্চলিক গণিত উৎসব আয়োজিত হচ্ছে, যার মধ্যে একটি কুমিল্লা। আয়োজনে সহযোগিতা করছে মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা কুমিল্লার সদস্যরা। উদ্বোধনের পর পরীক্ষা শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের শিক্ষক ও অভিভাবকেরা এসেছেন এই গণিত উৎসবে।
আয়োজকেরা জানান, কুমিল্লা আঞ্চলিক পর্বের বিজয়ীদের ফলাফল শিগগিরই বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের ওয়েবসাইটে (matholympiad.org.bd) প্রকাশ করা হবে।
এদিকে কুমিল্লা অঞ্চলের গণিত উৎসব ঘিরে প্রথমা প্রকাশন, স্বপ্ন’৭১ প্রকাশনসহ কয়েকটি প্রকাশনের স্টল বসেছে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রতিটি স্টলেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড় দেখা গেছে। তাঁরা বইয়ের স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। অনেকে নিজের পছন্দের বই কেনেন।
চলতি বছর গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার জন্য সারা দেশ থেকে অনলাইনে ৫১ হাজার ৫৩২ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছে। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথমে ‘অনলাইন বাছাই অলিম্পিয়াড’ অনুষ্ঠিত হয়। বাছাই অলিম্পিয়াডের বিজয়ীদের নিয়ে এখন দেশের ১২টি শহরে ‘আঞ্চলিক গণিত উৎসব’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কুমিল্লা ছাড়া অন্য ১১টি অঞ্চল হচ্ছে—ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, দিনাজপুর, সিরাজগঞ্জ ও কুষ্টিয়া। আঞ্চলিক গণিত উৎসবের বিজয়ীদের নিয়ে ঢাকার অনুষ্ঠিত হবে ‘জাতীয় গণিত উৎসব ২০২৬’। জাতীয় গণিত উৎসবের সেরাদের নিয়ে কয়েক ধাপে গণিত ক্যাম্প-কর্মশালার মাধ্যমে জুলাই মাসে চীনে অনুষ্ঠেয় ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য বাংলাদেশ দল নির্বাচন করা হবে।






