অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনার স্বপ্ন নিয়ে ১০–১২ বছর আগে অনেক ধার করে ওমানে যান কৃষক আবদুল মজিদের বড় ছেলে মুহাম্মদ রাশেদ (৪০)। সেখানে শ্রমিকের কাজ শুরু করেন তিনি। কিছুদিন পর ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে এক শেখের গাড়িচালক হিসেবে চাকরি নেন। পরে একে একে তিন ছোট ভাইকেও ওমান নিয়ে যান এবং তাদের জন্যও একই ধরনের চাকরির ব্যবস্থা করেন। এতে পরিবারে আসে সচ্ছলতা, গ্রামের বাড়িটি হয় দোতলা পাকা। কিন্তু সেই সুখ স্থায়ী হয়নি। গ্যাস দুর্ঘটনায় একসঙ্গে মারা যান চার ভাই।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাবাজার পাড়ার দোতলা পাকা বাড়ির সীমানায় দিনভর দাঁড়িয়ে ছিলেন আত্মীয়স্বজনসহ নানা বয়সী নারী-পুরুষ। তারা বাইরে থেকে শোক প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু বাড়ির ভিতরে কেউ ঢুকতে পারেননি। কারণ, নিহত প্রবাসী চার ভাইয়ের মা খাদিজা বেগম এখনো জানেন না যে তাঁর চার ছেলের কেউই বেঁচে নেই। তিনি শুধু জানেন ছেলেরা অসুস্থ। এই খবরেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। মৃত্যুর খবর সইতে না পারার ভয়ে বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলে মুহাম্মদ এনাম (৩২) বাড়ির ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন।
গতকাল বুধবার রাতে ওমান থেকে মায়ের কাছে ফোন করে দোয়া চেয়েছিলেন দুর্ঘটনায় নিহত বড় ছেলে মুহাম্মদ রাশেদ। তিনি ও তাঁর তিন ভাই তখন গাড়িতে করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। রাশেদ মাকে বলেন, "গাড়িতে তাঁদের নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাঁরা হাসপাতালে যাচ্ছেন।" এই ফোনের ১০ মিনিট পর চার ভাইয়ের মুঠোফোনেই আর সংযোগ পাওয়া যায়নি। আধা ঘণ্টা পর রাতে ওমানের মুলাদ্দা এলাকার একটি হাসপাতালের সামনে গাড়ির ভেতর থেকে তাঁদের লাশ উদ্ধার করা হয়।
নিহত চার ভাই হলেন মুহাম্মদ রাশেদ (৪০), মুহাম্মদ সাহেদ (৩৫), মুহাম্মদ সিরাজ (২৮) ও মুহাম্মদ শহিদ (২৪)। তাঁদের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাবাজার পাড়ায়। স্বজনরা জানান, অবিবাহিত দুই ভাই মুহাম্মদ সিরাজ ও শহিদ বিয়ে করতে দেশে আসার পরিকল্পনা করছিলেন। এজন্য বিমানের টিকিটও কেটেছিলেন। আজ শুক্রবার তাঁদের ফ্লাইটে ওঠার কথা ছিল। কেনাকাটা করতে চার ভাই এক গাড়িতে মার্কেটে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে গাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়া গ্যাসের বিষক্রিয়ায় মারা যান তারা।
খুব ছোটবেলায় মারা যান পাঁচ ভাইয়ের বাবা আবদুল মজিদ। মা অনেক সংগ্রাম করে ছেলেদের মানুষ করেন। এভাবে যে একসঙ্গে চারটা বুকের ধন চলে যাবে, বুকটা খালি হয়ে যাবে, সেটা কীভাবে মানবেন মারহিমা বেগম, নিহতদের স্বজন
তাঁদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনজন অবিবাহিত ছিলেন। দুজন বিয়ে করে সংসারী। গ্রামের বাড়িতে থাকেন মুহাম্মদ এনাম। নিহত রাশেদের স্ত্রী কুলসুমা আকতার ও সাহেদের স্ত্রী শান্তা আকতারও খবর পেয়ে অসুস্থ। তাঁদের দেখভাল করছেন মুহাম্মদ এনাম। নিহতদের খালাতো ভাই ইমরান হোসেন জানান, খালা এখনো খবর জানতে সুস্থ নন। তিনি কিছুটা সুস্থ হলে খবর দেওয়া হবে।
লালানগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আমির হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া বিরাজ করছে। লাশ দেশে আনার চেষ্টা চলছে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঘটনা জানার পর তাঁরা ওই বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পরিবার থেকে মায়ের নিরাপত্তার কারণে আপত্তি করায় তাঁরা যাননি। তবে তাঁদের লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়ায় উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করছে।






