লা লিগায় শিরোপা জয় নিশ্চিত করার পর বার্সেলোনার শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে উঠেছেন লামিনে ইয়ামাল। এই ঘটনা ইসরায়েল ও গাজায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
গত সোমবার কাতালান ক্লাবটির শিরোপা উদযাপনের সময় ছাদখোলা বাসে ইয়ামাল নিজের হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান। বার্সেলোনা শহরের রাজপথে প্রায় সাড়ে সাত লাখ সমর্থকের উপস্থিতিতে সেদিন ক্লাবটি জয়োল্লাস করে।
ইয়ামালের এই পতাকা ওড়ানোর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষণিকের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়। স্প্যানিশ তারকার ঘনিষ্ঠ কিছু সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে ‘দ্য অ্যাথলেটিক’কে জানান, পতাকা ওড়ানোর ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেন, ধর্মপ্রাণ মুসলিম ইয়ামাল ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট নিয়ে সর্বদা সংবেদনশীল। নিজের পরিচিতি ব্যবহার করে বিশ্বাস বা মতাদর্শ প্রকাশে তিনি কখনো কুণ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জীবনে ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। এমনকি পেশাদার ফুটবলার হয়েও রমজানে রোজা ও খেলাধুলার ভারসাম্য রক্ষার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এর আগে গত মার্চে মিসরের বিপক্ষে স্পেন জাতীয় দলের ম্যাচে দর্শকদের মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগানের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ইয়ামাল।
ইয়ামালের ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্প্যানিশ ভাষায় এক পোস্টে তিনি ১৮ বছর বয়সী এই ফুটবলারের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন। পাশাপাশি ইয়ামালের এ আচরণের দায় থেকে বার্সেলোনাকে দূরে থাকার আহ্বানও জানান কাৎজ।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “লামিনে ইয়ামাল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেওয়া বেছে নিয়েছেন; যখন আমাদের সেনারা হামাসের মতো একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়ছে। যে সংগঠন গত ৭ অক্টোবর ইহুদি শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো নৃশংসতা চালিয়েছে।”
তবে ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো ছাড়া ইয়ামাল আর কীভাবে ‘ঘৃণা উসকে দিয়েছেন’, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি কাৎজ।
কাৎজ আরও লিখেছেন, “যাঁরা এ ধরনের বার্তাকে সমর্থন করেন, তাঁদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করা উচিত—তাঁরা কি একে মানবিক মনে করেন? এটি কি নৈতিক? ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল ও ইহুদিদের বিরুদ্ধে উসকানির মুখে আমি চুপ থাকব না।”
বার্সেলোনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে কাৎজ লিখেছেন, “আমি আশা করি, এফসি বার্সেলোনার মতো একটি বড় ও সম্মানিত ক্লাব তাদের খেলোয়াড়ের এমন বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেবে। পাশাপাশি এটিও দ্ব্যর্থহীনভাবে পরিষ্কার করবে যে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন বা উসকানি দেওয়ার কোনো জায়গা এখানে নেই।”
ইসরায়েলি মন্ত্রীর এ বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাঁর হ্যান্ডল থেকে পোস্ট করা হয়, “একটি রাষ্ট্রের পতাকা ওড়ানোর বিষয়টিকে যাঁরা “ঘৃণা উসকে দেওয়া” বলে মনে করেন, তাঁরা হয় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন, নয়তো নিজের জঘন্য মানসিকতায় অন্ধ হয়ে গেছেন। লামিনে কেবল ফিলিস্তিনের প্রতি সেই সংহতিই প্রকাশ করেছেন, যা কোটি কোটি স্প্যানিশ নাগরিক মনেপ্রাণে ধারণ করেন। তাঁর জন্য গর্বিত হওয়ার এটি আরও একটি বড় কারণ।”
ফিলিস্তিনের গাজায় এক ধ্বংসস্তূপের মাঝে ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে ইয়ামালের একটি ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতে বর্তমান পর্যায়ে অঞ্চলটির এই এলাকা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে।
ফিলিস্তিনি শিল্পী উবাই আল-কুরশালি রয়টার্সকে বলেন, “সারা বিশ্ব দেখেছে, বার্সেলোনার এক বিশাল উৎসবে লামিনে ইয়ামাল ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছেন। এরপরই আমি এই দেয়ালচিত্র আঁকার কাজ শুরু করি। তিনি যা করেছেন, তার জন্য আমরা তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি ক্যারিয়ার, খেলা ও ভবিষ্যৎ—সবই ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন। কিন্তু সেসবে পরোয়া না করে তিনি ফিলিস্তিনের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।”
জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের স্থায়ী মিশন তাদের অফিশিয়াল ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডল থেকে ইয়ামালের পতাকা ওড়ানোর একটি ছবি শেয়ার করেছে। কাতালান ক্রীড়া দৈনিক ‘মুন্দো দেপোর্তিভো’র তোলা এই ছবিটি ৪ লাখ ৪০ হাজার অনুসারীর কাছে পৌঁছে দিয়েছে মিশনটি। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ইন্টারনেটে এক বার্তার মাধ্যমে ইয়ামালকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায়। এতে অন্তত ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গত মাসে জানায়, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি মন্ত্রী কাৎজের পোস্টের বিষয়ে ইয়ামালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল ‘দ্য অ্যাথলেটিক’–এর পক্ষ থেকে। তবে এ বিষয়ে বার্সেলোনার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে আসা সমালোচনা সম্পর্কে তাঁরা অবগত এবং এর সঙ্গে জড়িত সংবেদনশীলতা ও আবেগগুলো তাঁরা বুঝতে পারছেন। ক্লাবটি দাবি করেছে, ইয়ামাল বার্সেলোনার পক্ষ থেকে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি; এমনকি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়, দেশ বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যও তাঁর ছিল না।






