ফার্মগেটে সকালের শুরুতে রোকন তিনটি দৃশ্য দেখল। একটা মেয়ে ফুটপাত দিয়ে হেডফোন কানে গান শুনতে শুনতে যাচ্ছে। দৃশ্যটা সুন্দর। একটা রিকশা থামল, যাত্রী রিকশাওয়ালাকে ১০০ টাকা দিয়ে বাকি টাকা ফেরত নিতে না দিয়ে বলল, “রেখে দেন।” দৃশ্যটা সুন্দর। এক নববধূ গাড়িতে যাচ্ছিল, কিশোর ফুল হাতে দৌড়ে এসে বিক্রি করতে চাইলে নববধূ টাকা দিতে গেলেও সে না নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। দৃশ্যটা সুন্দর।
এই তিনটি দৃশ্য ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে রোকন দেখল এবং মনে মনে বলল—সবই সুন্দর দেখি। কিন্তু আমার কেন ভালো লাগে না?
অল্প দূরে তার ব্যাংক। পাঞ্চ করে বাঁ পা টেনে টেনে বসার জায়গায় গেল রোকন। কম্পিউটার সাইনইনের আগে বাঁ পায়ের কড়ে আঙুলের ব্যান্ডেজ দেখে নিল—আসা-যাওয়ার পথে কোনো চোট লাগল কি না। মিরপুর থেকে বাসে যায়। ভয় হয়, কেউ পা মাড়িয়ে দিতে পারে বা রিকশার চাকা উঠে যেতে পারে। যদি রক্ত গড়িয়ে পড়ে, তাহলে ডেটল বা ব্যান্ডেজ কোথায় পাবে? ক্ষতটা ইন্টারনাল হেমারেজ, বাইরে বোঝা যায় না। বহুদিন পর ভারী জুতো পরেছে আজ, গুঁতো লাগলে সামলানো যাবে। জুতো পরে অস্বস্তি ও লজ্জা লেগেছে, মশমশ শব্দ হচ্ছিল। বাসার ছোট বারান্দায় বেশ কয়েকবার হেঁটেছে এতে।
মাস তিনেক আগে ভোরে ঘুমের মধ্যে পায়ের আঙুলে কামড়ানোর মতো লেগেছিল, ভেবেছিল মশা। সকালে কোনো দাগ ছিল না। দিন পনেরো পর পা ভারী লাগতে শুরু করল, থপথপ করে হাঁটতে হল। ডাক্তার দেখিয়েছিল। ডাক্তার বলেছিল পা কাটতে। কারণ পিটেড কেরাটোলাইসিস, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ। ঘাম ও অতিরিক্ত পরিশ্রমে পায়ে চাপ পড়লে হয়। ছোট গর্ত হয় প্রথমে। রোকন প্রতিদিন হাঁটে, একসময় মিরপুর থেকে ফার্মগেট হেঁটে আসত ভাড়া বাঁচাতে। শরীর জন্ম থেকেই বেশি ঘামে।
আজকাল রাতে ঘুম হয় না রোকনের। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে জানালায় দাঁড়ায়, শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল অনুভূতি নামে। কাউকে বলেনি, কিন্তু ডাক্তার দেখানো দরকার মনে হচ্ছে। পায়ের অসুখের জন্য নাকি মনের? সপ্তাহখানেক আগে আরেক সমস্যা—সবকিছুর গন্ধ অদ্ভুত: ভাতে বিয়ারের গন্ধ, বইয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের মাটি, করাতে নারীর চুলের গন্ধ।
রাহেলার গল্পটা ভিন্ন। রাহেলা তার এক কাজিনের বান্ধবী ছিল। দুদিনই দেখা ও আলাপ। প্রথম দিন কাজিনদের বাসায়, লালমাটিয়ায়। দ্বিতীয় দিন ধানমন্ডি ২৭-এ বেঙ্গল গ্যালারিতে। রাহেলাই প্রথম রোকনকে অবাক করে দিয়ে বলেছিল, ‘একধরনের গন্ধ ভাইসা আসতেছে আপনার শরীল থিকা।’ রোকন জানতে চেয়েছিল, ‘কী রকম?’ রাহেলা বলেছিল, ‘দামি সাবানের গন্ধ।’
ছোটবেলায় বাবা-মা’র সঙ্গে কম সময় পেয়েছে রোকন, দুজনেই চাকরি করতেন। একমাত্র সন্তান, বুয়া দেখাশোনা করত। অভাব ছিল না, খেলনা-চকলেট ছিল। তবু সারাক্ষণ খারাপ লাগত।
আগামীকাল থেকে মাসখানেক ছুটি, আগেই আবেদন করেছে। কিন্তু এক মাস না শেষ হতেই রিজাইন দেবে, পাওনা নেবে। আজ শেষ অফিস।
সকালে গ্রাহকের ভিড়, মাসের প্রথম সপ্তাহ। পেনশনজীবী ও ডিপোজিট গ্রাহকরা। হঠাৎ রাহেলাকে দেখল অনেক বছর পর। ওড়না প্যাঁচানো, তবু চিনল, মাথা নুইয়ে ফেলল। রাহেলা কার্ড সেকশনে গেল।
জীবন স্মৃতির মঞ্চ। রোকনের জীবনে উজ্জ্বল স্মৃতি HSC রেজাল্টে আম্মাকে জড়ানো ছাড়া নেই। গড়পড়তা জীবন, রাহেলা এসেছিল ধূমকেতুর মতো, চলে গেছে।
রাহেলা কাজিনের বান্ধবী। প্রথম দেখায় বলেছিল, ‘একধরনের গন্ধ ভাইসা আসতেছে আপনার শরীল থিকা।’ রোকন জিজ্ঞেস করলে, ‘দামি সাবানের গন্ধ।’ অপ্রস্তুত হয়েছিল রোকন। কয়েকদিন পর বেঙ্গলে আবার দেখা। কাজিন শিঙাড়া-চা খাওয়াল। রাহেলা বলল, ‘আজও গন্ধ পাইতেছি আপনার কাছ থিকা।’ রোকন বলল, ‘সাবানের?’ রাহেলা বলল, ‘নাহ্, আজ পাইতেছি কাঁঠালচাঁপার।’ আর দেখা হয়নি। কাজিন বলেছিল, রাহেলা স্কলারশিপ নিয়ে মেলবোর্ন চলে গেছে।
গন্ধের ব্যাপার মনে ঢুকে গিয়েছিল। শরীরে সেই গন্ধ পেতে চেয়েছিল, পায়নি। আজ রাহেলাকে দেখে বলতে ইচ্ছে করল, ‘এখন আমি আমার শরীরে অদ্ভুত সব গন্ধ পাই। আপনি কি আজ কোনো গন্ধ পাইতেছেন, রাহেলা?’ কিন্তু বলল না, মাথা নুইয়ে নিল। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরল।
রোকন নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে অনেক আগে একটা বই কিনে এনেছিল। ফ্যান্টম লিম্ব সিনড্রোমে ভুগছিল সে নভেলের মূল চরিত্রটি। একটা অ্যাকসিডেন্টে সেই চরিত্র পা হারায়। ঘটনাস্থল থেকে এক নারী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এমন বাসায়, যেখান থেকে আর বেরোতে পারে না।
বিছানায় শুয়ে রমিজ স্যারের কথা মনে পড়ে। উচ্চমাধ্যমিকের অঙ্কের শিক্ষক। রহিমা খালা বাঁ পায়ে সালাম করলে ভয় পেল রোকন। খালা বলল, ‘ঝাড়ু লাগছে, তাই হাত দিয়া মাফ চাইলাম।’ ব্যান্ডেজ দেখল। রমিজ স্যার বলেছিলেন, ‘দেখো, মানুষ পায়ে কেন হাত দিয়ে সালাম করে জানো? পা গুরুত্বপূর্ণ, সম্মান ও অধীনতার প্রতীক। পা ছাড়া দাঁড়ানো যায় না, পায়ে পা লাগলে সরি বলে কিন্তু হাতে না। অদ্ভুত না?’ পরে কথাটা ভালো লেগেছে। এখন মনে হয় যেতে পারবে না কোথাও।
নীলক্ষেতের বইটা পড়ে ফ্যান্টম লিম্ব সিনড্রোম বুঝেছে—মস্তিষ্ক শরীরের মানচিত্র তৈরি করে, পা’কে বিচ্ছিন্ন করে।
রাতের বাসে বান্দরবান যাচ্ছে, টিকিট আগে কাটা। জানালার পাশে সিট, দুই সিটের টিকিট কিনেছে পায়ের জন্য। বান্দরবানে সকাল সাতটা-আটটা বাজবে। ঘুম ভাঙল কন্ট্রাক্টরের কথায়, ২০ মিনিট যাত্রাবিরতি। বাঁ পা অবশ লাগল। দাঁড়াতে পারল না, গোড়ালি চুলকালেও অনুভূতি নেই। ঘামতে শুরু করল, ঘাম থেকেই রোগ হয়েছে ডাক্তার বলেছিল। ঘামে কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পেল। মনে ছবি স্লাইডশোর মতো আসে-যায়।
তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সে তখন তার কাজিনকে বলে, ‘কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পাচ্ছি।’ তখন তার কাজিন বলে, ‘ও তো রাহেলা সিনড্রোম। রাহেলা পেত। অস্ট্রেলিয়া থাকার সময়ও বহু ডাক্তার দেখিয়েছে। কাজ হয়নি। বিভিন্ন ঘ্রাণ পায়।’ রোকনকে অ্যানেসথেসিয়া করার পর সে অন্য জগতে যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন রাহেলার মুখ ভাসছিল।
আঙুলে হাত রাখল, অবশ লাগছে, ডেটলের গন্ধ। দুঃস্বপ্নের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে, স্বপ্ন-বাস্তব গুলিয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলার লাট্টু স্বপ্ন-বাস্তব বলে দিত। এখন বাস্তবও স্বপ্ন মনে হয়।
সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে বান্দরবানে পৌঁছাল। যাত্রীরা নামছে, রোকন বসে আছে। হঠাৎ রাহেলার কণ্ঠ: ‘আরে, আপনে?’ স্বামীসহ পেছনে ছিল। ‘কেমন আছেন?’ রোকন বলল, ‘পায়ে সমস্যা হইতেছে। একটু হেল্প করবেন? হাতটা ধরবেন?’ তারা নামাল। পা কাজ করছে না টের পেল, কিন্তু বলল, ‘ঠিক হয়া যাইতেছে, থ্যাংকস।’ রাহেলা স্বামীকে বলল, ‘এই উনিই হচ্ছেন কাঁঠালচাঁপা, তোমাকে যার কথা বলেছিলাম।’ তারা চলে গেল, রোকন বসে পড়ল। কাঁঠালচাঁপার গন্ধ ভেসে আসছে।
মাসখানেকের মধ্যে খালা-ফুপিদের জোরে পা কাটতে হল। অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার সময় কাজিনকে বলল, ‘কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পাচ্ছি।’ কাজিন বলল, ‘ও তো রাহেলা সিনড্রোম। রাহেলা পেত। অস্ট্রেলিয়া থাকার সময়ও বহু ডাক্তার দেখিয়েছে। কাজ হয়নি। বিভিন্ন ঘ্রাণ পায়।’ অ্যানেসথেসিয়ায় ডুবে যাওয়ার সময় রাহেলার মুখ ভাসল।






