ফুটবলের বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াই নয়, এর চারপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য ইতিহাসের কোলাজ। এর মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা, রোমাঞ্চ এবং অজানা চমকের গল্প। আজ বলছি বিশ্বকাপের এমনই কয়েকটি গল্প।

এখন পরপর দুটি বিশ্বকাপ খেলা বড় কোনো কীর্তি নয়। উদাহরণস্বরূপ, আসন্ন উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে যদি লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো খেলেন, তাহলে তাঁদের জন্য এটি ৬ নম্বর বিশ্বকাপ হবে। তবে পরপর মাত্র দুটি বিশ্বকাপ খেলেও দুজন খেলোয়াড় বিশ্বকাপের ইতিহাসে আলাদা স্থান করে নিয়েছেন। তাঁদের একজন এরিক নিলসন, অন্যজন ফ্রেডি বিকেল।

কেন তাঁরা আলাদা? কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং পরে—উভয় বিশ্বকাপেই মাঠে নেমেছিলেন এই দুই ফুটবলার। ইতিহাসে তাঁদের ছাড়া কারও এমন অনন্য কীর্তি নেই। ১৯৩৮ সালে ইউরোপে যুদ্ধের কালো মেঘ জমে উঠছিল, তখন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ। তরুণ এরিক নিলসন সুইডেনের হয়ে এবং ফ্রেডি বিকেল সুইজারল্যান্ডের জার্সিতে সেই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর এল ১২ বছরের অন্ধকার—বিশ্বযুদ্ধের কারণে ফুটবল থমকে যায়। কিন্তু ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মারাকানায় যখন বিশ্বকাপ ফিরে আসে, তখনো দেখা যায় সেই দুই চেনা মুখ। এবার তাঁরা নিজ নিজ দেশের অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামেন।

দুজন ছিলেন ভিন্ন পজিশনের খেলোয়াড়। নিলসন লেফট-ব্যাকে, বিকেল ফরোয়ার্ডে। ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে নিলসনের অভিষেক হয়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী সেই ম্যাচে সুইডেন হারলেও নিলসন প্রমাণ করেন তিনি দীর্ঘ রেসের ঘোড়া। ১৯৪৮ অলিম্পিকে সোনা জিতার পর ১৯৫০ বিশ্বকাপে তিনি ব্রাজিল যান অধিনায়ক হিসেবে। তাঁর নেতৃত্বে সুইডেন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারায়।

তবে ১৯৫০ বিশ্বকাপ নিলসনের জন্য পুরোপুরি সুখের ছিল না। স্বাগতিক ব্রাজিলের কাছে ৭-১ গোলে হেরে যায় সুইডেন। সেই ম্যাচে ব্রাজিলের তারকা আদেমির একাই ৪ গোল করেন। আদেমির সেই বুটের গোড়ালিতে পেরেক দিয়ে নিজের নাম খোদাই করা ছিল। ফুটবল ইতিহাসে তিনিই সম্ভবত প্রথম নিজের নাম লেখা বুট পরে মাঠে নামেন। সেই গল্প অন্যদিনের জন্য রাখা যাক। নিলসনের সুইডেন ভেঙে পড়েনি। স্পেনকে হারিয়ে তৃতীয় হয় এবং নিলসন টুর্নামেন্টের অল-স্টার দলে স্থান পান।

অন্যদিকে ফ্রেডি বিকেল ছিলেন দুর্দান্ত ফরোয়ার্ড। ১৯৩৮ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে জার্মানি ২-০ গোলে এগিয়ে থাকলেও বিকেলের এক শটে সমতা ফেরে। শেষে সুইজারল্যান্ড ৪-২ গোলে জার্মানিকে হারায়। ১৯৫০ বিশ্বকাপে সাও পাওলোতে ব্রাজিলের বিপক্ষে বিকেলের নেতৃত্বে সুইজারল্যান্ড ২-২ ড্র করে। ফুটবল জগৎ সেই লড়াই দেখে থমকে যায়।

লম্বা ক্যারিয়ার সত্ত্বেও নিলসন ও বিকেল আন্তর্জাতিক মাঠে মাত্র একবার মুখোমুখি হন। ১৯৫০ বিশ্বকাপের পর জেনেভায় সুইডেন-সুইজারল্যান্ড ম্যাচে দুজনেই অধিনায়ক ছিলেন। বিকেলের সুইজারল্যান্ড ৪-২ গোলে হারে নিলসনের সুইডেনের কাছে।

এই দুই খেলোয়াড়ের মতো বিরল কীর্তি দুই কোচেরও আছে। ১৯৩৮ সালে সুইজারল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচে ডাগআউটে ছিলেন জার্মানির সেপ হারবারগার এবং সুইজারল্যান্ডের কার্ল রাপ্পান। ঠিক ২৪ বছর পর ১৯৬২ বিশ্বকাপে দুই দল আবার মুখোমুখি হলে ডাগআউটে সেই দুই কোচই ফিরে আসেন। সেবার হারবারগারের জার্মানি রাপ্পানের সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে প্রতিশোধ নেয়।