জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের লেখা পাঁচটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কারাজীবনের স্মৃতি উঠে এল আলোচনায়। একই মঞ্চে বসে সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা রাজনৈতিক জীবনের জেল, নির্যাতন ও গণ-আন্দোলনের স্মৃতি শেয়ার করেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত দেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তাঁরা।

বুধবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে মিয়া গোলাম পরওয়ারের লেখা পাঁচটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন কারাগারে একসঙ্গে থাকার স্মৃতি তুলে ধরেন পানিসম্পদমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও মিয়া গোলাম পরওয়ার।

অনুষ্ঠানে মোড়ক উন্মোচিত বইগুলো হলো ‘লৌহকপাটের অন্যজীবন’, ‘মুমিনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার সালাত ও সবর’, ‘মুমিনের জীবনে নিয়ামত ও মুসিবত’, ‘ঈমানের উন্নতি’ ও ‘কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। প্রচ্ছদ প্রকাশনী থেকে এসব বই প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কারাগারে থাকাকালে মিয়া গোলাম পরওয়ার এগুলো লিখেছেন। এর মধ্যে ‘লৌহকপাটের অন্যজীবন’ বইয়ে কারাগারে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতি তুলে ধরেছেন তিনি।

কারাজীবনের স্মৃতি উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দীর্ঘ কারাজীবনে অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে। বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও আবদুস সালাম পিন্টুর সঙ্গে কারাগারে থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। শেখ হাসিনার সরকারের সময় তাঁরা একসঙ্গে কারাগারে ছিলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় গ্রেপ্তারের পর ডিবি কার্যালয় ও কারাগারে কাটানোর প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘কারাগারে থাকার সময় ডায়েরিতে স্মৃতিগুলো লিখে রাখতাম। বিভিন্ন জেলে থাকার কারণে ডায়েরিগুলো সংরক্ষণ করতে কষ্ট হতো। কারাগারে থাকা অবস্থায় কখনো ভাবিনি, একদিন মুক্ত হয়ে বই আকারে নিজের লেখাগুলো প্রকাশ করতে পারব। সেই সময় এতটাই কঠিন ছিল যে অনেকেরই মনে হতো, হয়তো আর মুক্তি মিলবে না। কারাগারে থাকা অবস্থায় আজহারুল ইসলামের বিভিন্ন বক্তব্য ও আলোচনা বইয়ে তুলে ধরেছি।’

সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দেশের মানুষ যেন আর কখনো জুলুম-নির্যাতনের কালো অধ্যায় না দেখে। অতীতের সেই দুঃসময় থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাইকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

পরে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও কারাজীবনের স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে জেলে গিয়েছি, নির্যাতনের শিকার হয়েছি। কিন্তু বই লিখব, সেই সুযোগটা পাইনি। জেলে গিয়ে ডায়েরি লিখেছি, কিন্তু বের হয়ে আর বই প্রকাশ করা হয়নি, যেটা মিয়া গোলাম পরওয়ার করেছেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় একবার জেলে গিয়েছিলাম। আর হাসিনার আমলে ১১-১২ বার জেলে গিয়েছি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সাড়ে ছয় মাস জেলে ছিলাম। আর জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সর্বনিম্ন ১২ দিন কারাগারে ছিলাম।’

জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কারাজীবনের স্মৃতি শেয়ার করে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘এক-এগারোর সময় ব্যারিস্টার আরমানের বাবা মীর কাসেম আলীর সঙ্গে কাশিমপুর কারাগারে দেখা হয়েছিল। আমার সেলে কাঁঠাল বেশি হয় শুনে তিনি আমাকে কাঁঠাল পাঠাতে বলেন। আমি ২৬ নম্বর সেলে ছিলাম, সেখানকার কাঁঠালগাছে অনেক কাঁঠাল হতো। তিনি কাঁঠাল খেতে পছন্দ করতেন। আমি ওই সব গাছ থেকে কাঁঠাল কেটে তাঁর জন্য পাঠাতাম।’

স্মৃতিচারণা করে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘একবার বিএনপি ও জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা মিলে আবদুস সালাম পিন্টু ও আমাকে ভালো খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব দিলেন। আমার কারাগার থেকে মুক্তি উপলক্ষে এই খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করতে বলেন তাঁরা। আমি দায়িত্ব পেয়ে দেশি মুরগির মাংস দিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করলাম। খাওয়াদাওয়া শেষে ওই দিন সন্ধ্যায়ই হাসিনা সরকার সবাইকে আলাদা আলাদা জায়গায় পাঠিয়ে দিল, যাতে এ ধরনের আয়োজন আর না করা যায়। ওই রাতেই আমি জামিনে মুক্তি পেলাম।’

মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে স্মৃতি উল্লেখ করে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘কারাগারে যাওয়ার পর মিয়া গোলাম পরওয়ার আমাকে দাওয়াত করে খাওয়াতেন। সকালে নাশতা করাতেন। আমাদের নামাজের ইমাম ছিলেন জামায়াতের বর্তমান আমির শফিকুর রহমান।’

জামায়াত নেতাদের উদ্দেশে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদে আমরা যেভাবে কথা বলি, বাইরেও যেন সেটা রাখতে পারি। সংসদ এবং বাইরের বক্তব্যে আপনাদের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য থাকা উচিত নয়। কারণ, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম আমাদের একসঙ্গে করতে হয়েছে। সবাই মিলে নতুনভাবে দেশ গড়ব, সাধারণ মানুষের সেটাই আশা-প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার জায়গা থেকে আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকি।’

এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, মিয়া গোলাম পরওয়ারের লেখা বইয়ের উদ্দেশ্য শুধু কারাজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা নয়। লেখার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, নতুন প্রজন্ম যারা স্বৈরাচারের জুলুম-নির্যাতন দেখার সুযোগ পায়নি, তারা যেন এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়, সেটি যেন তারা জানতে পারে। এই বই পাঠের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের তরুণেরা সাহসী হবে। জাতিকে জাগ্রত করতে হলে লেখনীর মাধ্যমেই করতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম, জামায়াতের নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আমির আবদুল জব্বার, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আতিকুর রহমান ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। সভাপতিত্ব করেন প্রচ্ছদ প্রকাশনীর চেয়ারম্যান রাজিফুল হাসান।