ইউরোপের নেতারা এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন, এবং এটি আর কোনো একক ঘটনার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি বড় পরিবর্তন—ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আগের নির্ভরশীল ও নম্র অবস্থান ত্যাগ করে ধীরে ধীরে দৃঢ়তর ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে।
গত মাসে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস যখন ট্রাম্পের সমালোচনা করেন, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত মতামত বা বার্লিন ও হোয়াইট হাউসের সাময়িক দূরত্বের প্রতিফলন ছিল না। এটি ছিল ইউরোপীয় নেতৃত্বের বিস্তৃত মানসিকতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে তারা ইরান, ইউক্রেন বা ইউরোপের সার্বভৌমত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলতে প্রস্তুত।
এই পরিবর্তনের একটি প্রধান কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা ও অস্থির নীতি। অনেক ইউরোপীয় নেতা মনে করছেন, এমন নীতির জবাবে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখানো এখন জরুরি।
মের্ৎস ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেন। নিজের নির্বাচনী এলাকার একটি স্কুলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “ট্রাম্পের কোনো কার্যকর প্রস্থান কৌশল নেই। উল্টো ইরানের কূটনৈতিক দক্ষতা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপমানিত’ করেছে।” মের্ৎস একা নন; ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ইতালির জর্জিয়া মেলোনির মতো নেতারাও সাম্প্রতিককালে কঠোর মন্তব্য করেছেন।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের চেষ্টা ইউরোপের কাছে স্পষ্ট অগ্রহণযোগ্য ছিল। এটি ন্যাটোর এক মিত্র দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও গ্রিনল্যান্ডের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অস্বীকার করেছিল। একইভাবে ট্রাম্প ও তাঁর সহকারী জেডি ভ্যান্স হাঙ্গেরির নির্বাচনে ভিক্তর আরবানকে সুবিধা দিতে চেয়েছিলেন, যা ইউরোপে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।
এই ঘটনাগুলো ছাড়াও বড় কারণ হলো ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আগের তুলনায় কমে যাওয়ার বিশ্বাস গড়ে ওঠা। ইরান যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপের সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে নির্ভরতা একমুখী নয়।
একইসঙ্গে ইউরোপ নিজস্ব সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর বড় অংশ এখন ইউরোপীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের দিকে যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইউরোপের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী, গবেষণা সংস্থা সিপ্রির হিসাবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের অংশ ৬৪ শতাংশ থেকে ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইউক্রেন প্রশ্নেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ইউক্রেনের অধিকাংশ অর্থ এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসছে। ইউক্রেন ন্যাটোর তালিকা অনুযায়ী অস্ত্র কিনছে, তবে বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে—প্রায় ৬০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন এবং ২০ শতাংশ ইউরোপ থেকে।
এছাড়া ইউরোপীয় সরকারগুলো বুঝতে পারছে, ট্রাম্পের অনেক হুমকি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, আদালত এবং নিজের রাজনৈতিক শিবির থেকেও বিরোধিতা বাড়ছে। হাঙ্গেরিতে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপে ‘মাগা’ আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ কমেছে। ইউরোপের সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কম থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নেতাদের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে।
এই পরিবর্তিত মানসিকতা ভবিষ্যতে বাণিজ্য বিরোধেও প্রভাব ফেলবে। ট্রাম্প যদি ইউরোপীয় গাড়ির মতো পণ্যে শুল্ক বাড়ান, ইউরোপ আগের মতো নরম প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলো প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের আমেরিকান পণ্যের ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে, যদিও প্রাথমিকভাবে আলোচনার দরজা খোলা রাখা হবে।
সারাংশে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। ইউরোপ আর আগের মতো নতজানু নয়; তারা বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রতিরোধের ক্ষমতা এখন তাদের আছে।
মুজতবা রহমান ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত






