উন্নত দেশগুলোতে এখন সবাই দৈনন্দিন কেনাকাটায় নগদের বদলে কার্ড ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশেও সেই প্রবণতা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে কোভিড-এর পর থেকে নগদ লেনদেন কমে ডিজিটাল পেমেন্ট বেড়েছে। এর সামনে রয়েছে ক্রেডিট কার্ড, যা সব শ্রেণির মানুষের কাছে, বিশেষ করে চাকরিজীবী ও তরুণদের মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ব্র্যাক ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড খাতে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। আমাদের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকসংখ্যা ইতিমধ্যে তিন লাখ ছাড়িয়েছে এবং প্রতিবছর লেনদেনের প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হারে বাড়ছে। এর মূলে রয়েছে বছরজুড়ে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও লাইফস্টাইল পণ্য কেনাকাটায় আকর্ষণীয় অফার এবং ইএমআই বা কিস্তিতে পরিশোধের সুবিধা। এগুলো গ্রাহকদের আর্থিক স্বাধীনতা দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে অর্থের ব্যবস্থা করে তাঁদের চিন্তামুক্ত রাখে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ডিজিটাল পেমেন্টকে আরও গতিময় করেছে। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের অনিরাপদ ঋণের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা করা হয়েছে। এটি একটি বড় অর্জন। অনেক গ্রাহকই তাঁদের ঋণসীমা বাড়ানোর অনুরোধ করতেন, যা আগে আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভব হতো না। এখন গ্রাহকেরা তাঁদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী আগের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবেন। ব্যাংকও গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আরও উন্নত সেবা প্রদানে সক্ষম হবে। এই নীতিগত সহায়তা ব্যাংক ও গ্রাহক—উভয় পক্ষকেই লাভবান করবে।
ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে কিছু দ্বিধা এখনো কাজ করে। এই দ্বিধা দূর করতে আমরা শুরু থেকেই স্বচ্ছতার নীতি অনুসরণ করছি। চার্জ বা সুদের হার সম্পর্কে সব তথ্য আমাদের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত দেওয়া থাকে এবং কার্ড ইস্যু করার সময় গ্রাহককে সবকিছু স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলা হয়। বিশেষ করে নারী গ্রাহকদের জন্য আমাদের আলাদা অগ্রাধিকার রয়েছে। ‘মাস্টারকার্ড তারা ওয়ার্ল্ড’ ও ‘ভিসা তারা প্ল্যাটিনাম’-এর মতো বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীদের আমরা প্রচলিত হারের চেয়ে কম সুদে সেবা দিচ্ছি।
ব্র্যাক ব্যাংকের মূল দর্শনের একটি বড় অংশজুড়ে আছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) উদ্যোক্তারা। তাঁদের লেনদেন সহজ করতে আমরা ‘বাংলা কিউআর’ স্ট্যান্ডার্ডের ভিত্তিতে কিউআর পেমেন্ট সুবিধা চালু করেছি। আমাদের ‘আস্থা’ অ্যাপ ব্যবহার করে বর্তমানে দেশের সাড়ে তিন লক্ষাধিক মার্চেন্ট পয়েন্টে পেমেন্ট করা সম্ভব। এর বাইরে আমরা ‘এসএমই ক্রেডিট কার্ড’ নিয়ে এসেছি, যা ব্যবসায়ীদের ট্রাভেল কোটার বাইরেও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ করে দিচ্ছে।
প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আমরা সবসময় এগিয়ে থাকতে চাই। সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক ভিসা ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের জন্য ‘গুগল পে’ সেবা চালু করেছে। ফলে এনএফসি সক্রিয় মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই গ্রাহকেরা এখন স্পর্শহীন লেনদেন করতে পারছেন। এর পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘স্মার্ট পিওএস’ ডিভাইস নিয়ে আসতে যাচ্ছি। এই ডিভাইসে পেমেন্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘রিয়েল-টাইম ভয়েস নোটিফিকেশন পাওয়া যাবে, যা মার্চেন্ট ও গ্রাহক উভয়ের জন্যই বাড়তি স্বস্তি। জালিয়াতি রোধে আমাদের ‘রিয়েল-টাইম ফ্রড ডিটেকশন অ্যালার্ট’ ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
এত সব সম্ভাবনার মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে। ডিজিটাল লিটারেসি বা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব আমাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা। আমাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দ্রুত আধুনিক ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসা। আমরা আমাদের এই ডিজিটাল সেবাগুলোকে শহর থেকে গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে দিতে চাই।
● লেখক: ডিএমডি ও প্রধান (রিটেইল ব্যাংকিং), ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি।






