সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে হাজির হয়ে দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। বিচারকের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যেখানে সুবিচার নেই, সেখানে বিচার তিনি চান না।”

আজ বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ব্যক্তিগত হাজিরা মওকুফের আবেদন নিয়ে এই প্রকাশ করেন তিনি। তবে ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা আবেদনটি মঞ্জুর করেন।

আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত লতিফ সিদ্দিকী জুলাই অভ্যুত্থানের পর গত বছরের আগস্টে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠান থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরবর্তীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এক মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। কয়েক মাস পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু মামলাটি এখনো চলছে এবং আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে তাঁকে।

আজ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ও আসামিদের হাজিরার জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু তদন্তকারী শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তৌফিক হাসান প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি।

লতিফ সিদ্দিকী আগেই আইনজীবীর মাধ্যমে হাজিরা দেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে।

কাঠগড়ায় থেকে তখন তিনি বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলেন, “যেখানে সুবিচার নেই, সেখানে আমি বিচার চাই না। আমি আর এখানে বিচার চাইতে আসতে চাই না। ছয় মাস ধরে ঘুরছি। আমার এখন আনন্দ লাগছে। আমি পিটিশন (ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতির আবেদন) প্রত্যাহার করছি।”

বিচারক তখন বলেন, “সেটা আপনার ব্যাপার, আপনি কী করবেন?”

সাবেক আইনপ্রণেতা লতিফ সিদ্দিকী পরে বলেন, আদালত অবমাননাকর কোনো কথা বলে থাকলে বিচারক যেন ক্ষমা করে দেন।

বেলা ১১টায় আদালতে হাজির হন লতিফ সিদ্দিকী। ১১টা ১০ মিনিটের দিকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো দুই আসামিকে তিনি চকলেট খাওয়ান। সোয়া ১১টায় বিচারক তাঁকে ডাকেন। এজলাস শেষে আদালত প্রাঙ্গণে শিশুদের চকলেট এবং ভিক্ষুকদের ভিক্ষা দেন তিনি।

আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের লতিফ সিদ্দিকী বলেন, “এ দেশে কি বিচার আছে? বিচার হয় নাকি? বঙ্গবন্ধু গেছে, জিয়া গেছে, এরশাদ গেছে, খালেদা গেছে, হাসিনা গেছে, ইউনূস গেছে। সবাই যায়, কিন্তু নতুন কিছু আসে না।”

বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক বলেন, “আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করছিলাম। ৫২–এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বছর দশেক জেল খাটছিলাম। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দোসর আছিলাম। স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছি, পাকিস্তান ভেঙেছি, তার জন্যই আজ এখানে এসেছি।”

আবেদন প্রত্যাহারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার আনন্দ লাগছে এখন। এখানে এলে আনন্দ পাওয়া যায়, বাংলাদেশের আসল চিত্র অর্থাৎ আইনের শাসন আছে কি না, সেটা দেখা ও বোঝা যায়। একটা অনুভব হয়, উপলব্ধি হয়। সেই অনুভবকে জাগ্রত রাখতেই পিটিশন বাতিলের জন্য বলেছি।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে তাঁকে মন্ত্রী করা হয়। হজ নিয়ে বিতর্কিত এক মন্তব্যের জেরে ২০১৪ সালে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয় এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হন।

২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য হন তিনি। ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সংসদ বিলুপ্ত হলে তাঁর সংসদ সদস্যপদের অবসান ঘটে।

গত বছরের ২৮ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘মঞ্চ ৭১’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন তিনি। একদল ব্যক্তি সেখানে ঢুকে হট্টগোল করে অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেন এবং আয়োজকদের ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দালাল’ বলে লাঞ্ছিত করেন।

পরে পুলিশ লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জনকে আটক করে। পরদিন শাহবাগ থানার এসআই আমিরুল ইসলাম সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।