বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড এখন কেবল কেনাকাটার মাধ্যম নয়, জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠেছে। ২০০৯ সালে ‘আমেরিকান এক্সপ্রেস’ (অ্যামেক্স) দেশে আগমনের পর এই খাতে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কার্ডের নতুন নীতিমালা, আধুনিক জীবনের স্মার্ট সমাধান, প্রিমিয়াম সেবা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার সমন্বয়ে সিটি ব্যাংকের আগামী পরিকল্পনা নিয়ে মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মোহাম্মদ মিরাজ

বাংলাদেশে ‘আমেরিকান এক্সপ্রেস’ (অ্যামেক্স)-এর মাধ্যমে আপনারা যে বাজার গড়ে তুলেছেন, সেখানে নতুন গ্রাহক আকর্ষণের পরিকল্পনা কী?

মাসরুর আরেফিন: অ্যামেক্স আমাদের ব্যাংকের জন্য গর্বের ব্র্যান্ড। বর্তমানে আমাদের প্রায় ১০ লাখ অ্যামেক্স কার্ড গ্রাহক রয়েছেন। এই সংখ্যা বাড়াতে আমরা ‘স্মার্ট লাইফস্টাইল’ ও ‘ডিজিটাল সুবিধা’র উপর জোর দিচ্ছি। ইতিমধ্যে ভিসা ও মাস্টারকার্ডে চালু গুগল পে সেবা শিগগিরই অ্যামেক্স গ্রাহকদের জন্যও চালু হবে। তরুণ, ভ্রমণপ্রেমী ও উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য এনেছি অ্যামেক্স আলট্রামেরিন ক্রেডিট কার্ড, যা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, কেনাকাটা, এক্সক্লুসিভ অফার ও বিশেষ সেবায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। গ্রাহকদের জন্য অফার ও অংশীদারত্ব বাড়িয়ে প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করছি। দেশের গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান ক্রয়ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রত্যাশা অ্যামেক্স কার্ডকে আরও জনপ্রিয় করবে।

অনলাইন কেনাকাটা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনে আপনাদের কার্ড কতটা গ্রাহকবান্ধব?

মাসরুর আরেফিন: গ্রাহকের স্বাচ্ছন্দ্য মাথায় রেখে প্রতিটি কার্ডের সেবা চালু রয়েছে। যেমন সিটিম্যাক্স ডেবিট কার্ডে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ১% ক্যাশব্যাক পাওয়া যায়। অ্যামেক্স ক্রেডিট কার্ডে রয়েছে মেম্বারশিপ রিওয়ার্ড পয়েন্টস। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে সিটিটাচ ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ। গ্রাহক এখন কল সেন্টারে ফোন না করেই আন্তর্জাতিক লেনদেন চালু বা বন্ধ করতে পারেন। এই ডিজিটাল ক্ষমতায়ন লেনদেনকে দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত করেছে। গুগল পে সেবা লেনদেনকে আরও সহজ ও নিরাপদ করবে।

আন্তর্জাতিক মানের ক্রেডিট কার্ড সুবিধা দেশের গ্রাহকেরা কতটা ভোগ করছেন? নতুন নীতিমালা কতটা সহায়ক?

মাসরুর আরেফিন: আন্তর্জাতিক সুবিধার বড় অংশ গ্রাহকেরা পাচ্ছেন। এর জন্য সিটি ব্যাংকের খরচের বড় অংশ ব্যয় হয় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাউঞ্জ ব্যবস্থাপনায়। বিশ্বজুড়ে ‘প্রায়োরিটি পাস’ সুবিধা এখন গ্রাহকদের নাগালে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গাইডলাইন বৈশ্বিক মানে উন্নীত হতে সাহায্য করেছে। জামানতবিহীন ক্রেডিট লিমিট ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা বাড়ায় একজন গ্রাহক এক কার্ডে ১২ হাজার ডলারের ট্রাভেল কোটা ব্যবহার করতে পারছেন। প্রতিটি অনলাইন লেনদেনে ওটিপি ভেরিফিকেশন, উন্নত এনক্রিপশন ও ফ্রড মনিটরিং বাধ্যতামূলক হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় গ্রাহকেরা আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সুবিধা ও প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন।

কেনাকাটার ছাড় ছাড়া কার্ডধারীরা কী ধরনের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন?

মাসরুর আরেফিন: ছাড়ের বাইরে অ্যামেক্স কার্ডের রিওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বার্ষিক চার্জ মওকুফ, কার্ডের বিল পরিশোধ, ভ্রমণ ও শপিংয়ে ব্যবহার করা যায়। গোল্ড ও প্লাটিনাম কার্ডধারীদের জন্য বিনা মূল্যে আন্তর্জাতিক লাউঞ্জ সুবিধা রয়েছে। সেরা রেস্টুরেন্টে বাই ওয়ান গেট থ্রি পর্যন্ত ফ্রি বুফে অফার এবং ফ্লেক্সিবাই–এর মাধ্যমে ০% সুদে ৩৬ মাস পর্যন্ত কিস্তি সুবিধা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ঋণের সীমা বাড়ানোর লেনদেনে প্রভাব কী?

মাসরুর আরেফিন: জামানতবিহীন ক্রেডিট কার্ডের লিমিট ২০ লাখ টাকা করায় গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকে ইতিমধ্যে লিমিট বাড়িয়েছেন। তবে প্রকৃত প্রভাব বোঝাতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে।

‘সিটিটাচ’ অ্যাপ কার্ডের সঙ্গে সমন্বয়ে গ্রাহক অভিজ্ঞতা কীভাবে বদলে দিচ্ছে?

মাসরুর আরেফিন: সিটিটাচ শীর্ষস্থানীয় ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাপ। গ্রাহকেরা অ্যাপে কার্ডে আন্তর্জাতিক লেনদেন চালু-বন্ধ, বিল পরিশোধ, নতুন কার্ড সচল, রিওয়ার্ড পয়েন্ট রিডিম, ফান্ড ট্রান্সফার, স্টেটমেন্ট ডাউনলোড ও কার্ড হারালে তাৎক্ষণিক ব্লক করতে পারেন।

কার্ড বাজারে প্রতিযোগিতায় সিটি ব্যাংক কীভাবে ভিন্নতা রক্ষা করছে?

মাসরুর আরেফিন: দেশের ক্রেডিট কার্ড বাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ সিটি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে। মূল শক্তি একক অংশীদারত্বে অ্যামেক্স কার্ড ইস্যু ও অ্যাকুইয়ার করা। নিজস্ব বিমানবন্দর লাউঞ্জ, সুদক্ষ সেলস টিম ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আমাদের আলাদা করে।

ব্যবসায়ীরা কেন কিউআর কোড বা পস মেশিনে আগ্রহী হবে? তাঁদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ কী?

মাসরুর আরেফিন: ব্যবসায়ীদের বিনা মূল্যে পস মেশিন ও কিউআর কোড দিই এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ব্যাংক বহন করে। এতে সহজ-নিরাপদ লেনদেন ও গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়ে। বিক্রি বাড়াতে ক্যাশব্যাক, ডিসকাউন্ট ও প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন চালাই। পসভিত্তিক ঋণ মডেল নিয়ে কাজ করছি, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বল্পমেয়াদি মূলধন সংকটে সাহায্য করবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই লক্ষ্য।