রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের শয্যাসংকটে মেঝেতে বসে হামে আক্রান্ত ছয় মাসের শিশু নূর নাহারের মুখে নেবুলাইজ করছিলেন মা স্বর্ণা আক্তার। তাঁর সঙ্গে আর কেউ ছিল না। স্বর্ণার চোখে পানি। জিজ্ঞাসা করতেই তাঁর কান্না ফেটে পড়ল। শিশুর বাবা কোথায়? এ প্রশ্নে তিনি বললেন, ‘বাবা থাইকাও নাই!’

পাশের শয্যায় থাকা এক রোগী জানান, ‘উনি একাই এসেছেন। আর কেউ নাই।’

তিন দিন ধরে তীব্র জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন নূর নাহার। হাসপাতালে ভর্তির কথা বলায় স্বর্ণার স্বামী রাসেল (পেশায় ট্রাকচালক) বলেন, ‘আমি পারুম না।’ এমনকি স্বর্ণাকে হাসপাতালে যাওয়া থেকেও তিনি বিরত করেন।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা একটার দিকে কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে স্বর্ণা শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন। বেলা দুইটা পর্যন্ত তিনি কিছু খাননি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘরে চাল, ডাল, তরকারি কিছুই ছিল না। ‘রাস্তার থেন দুইডা বিস্কুট খাইছি।’

স্বামীর সাহায্য না পেয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিয়ে হাসপাতালে আসেন স্বর্ণা। গাড়িভাড়া ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার পর তাঁর কাছে বাকি ১০০ টাকা।

২২ বছর বয়সী স্বর্ণার বাবা কৃষিকাজ করেন। চার বছর আগে নিজের পছন্দে রাসেলকে বিয়ে করেন। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ছয় মাস বয়সী শিশুদের আদর্শ ওজন ৭ থেকে ৯ কেজি। কিন্তু নূর নাহারের ওজন মাত্র তিন কেজি। দেড় মাস আগে ছিল চার কেজি। অসুস্থতায় ওজন কমেছে। স্বর্ণা বলেন, স্বামী চিকিৎসায় অনীহা দেখান, এমনকি মারধর করেন। পরে তিনি কিশোরগঞ্জে মায়ের বাড়ি যান।

সেখানে শিশুর অবস্থা আরও খারাপ হলে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেন। ওষুধ খাওয়ানো হয় কিন্তু কাজ হয়নি। চিকিৎসকেরা ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। আবার কেরানীগঞ্জে ফিরে আসেন স্বর্ণা।

দুই সপ্তাহ আগে নূর নাহারকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। চিকিৎসকেরা জানান, শিশুর নিউমোনিয়াও হয়েছে। চার দিন থেকে টাকার অভাবে হাসপাতাল ছেড়ে কেরানীগঞ্জে ফিরে যান।

সন্তান জন্মের আগে বিভিন্ন বাসায় কাজ করতেন স্বর্ণা, টাকা সংসারে দিতেন। সন্তান হওয়ার পর কাজে যেতে পারেন না। তখন থেকে স্বামীর আচরণ বদলে যায়। কয়েক মাস ধরে বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে চাপ দিচ্ছেন রাসেল।

নূর নাহারের অবস্থা গুরুতর। স্বর্ণার কাছে টাকা নেই। সামনে কী করবেন, কীভাবে চিকিৎসা চালাবেন—কোনো উত্তর জানেন না এই মা।

ঢাকার বাইরের রোগী বেশি

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ জন রোগী ভর্তি। মৃত্যু হয়েছে দুজনের—একজন হামের উপসর্গ নিয়ে, আরেকজনের হাম শনাক্ত।

রোগীদের তথ্য থাকলেও জেলার বিস্তারিত নেই। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত হাম ও উপসর্গ নিয়ে ৭৩৩ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার ২২৬ জন, বাকি ৫০৭ জন ঢাকার বাইরের। ঢাকার পর নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জের রোগী বেশি।

হাসপাতালে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩৮ জনের মৃত্যু, নিশ্চিত হামে সাতজনের।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, বর্তমানে ৫০ থেকে ৫৫ জন রোগী ভর্তি। হামের প্রকোপ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও আশঙ্কা কাটেনি। তিনি ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন।