দেশে নগদহীন লেনদেনের প্রসার ঘটাতে ক্রেডিট কার্ড এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলো কার্ড সেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। নতুন ব্র্যান্ডের কার্ড ও আকর্ষণীয় অফার যুক্ত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রাহকবান্ধব পরিবেশ গড়তে এবং ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করেছে। এতে ঋণসীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে এবং সুদের হার ও আদায়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঋণ পাওয়ার পরিধি এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ। আগে যেখানে ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যেত, এখন তা বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো এখন কোনো জামানত ছাড়াই একজন গ্রাহককে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে, যা আগে ছিল ১০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে জামানতের বিপরীতে ঋণের সীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে। সাধারণত ব্যাংক হিসাবে স্থায়ী আমানত বা লিকুইড সিকিউরিটির বিপরীতে এই ঋণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কার্ডধারীরা তাঁদের মোট ঋণসীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ সরাসরি নগদ হিসেবে উত্তোলন করতে পারবেন।

ভোক্তাঋণের বাজারে শীর্ষস্থানে আছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহীয়ুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও নগদ টাকার চাহিদা বিবেচনায় কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। যাঁরা ঋণের সীমা বাড়াতে চাইছেন, তাঁদের সক্ষমতা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের নিচে রাখা।”

সুদ ও মাশুলে কঠোর শৃঙ্খলা

ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার নিয়ে গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের অবসান ঘটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডে ঋণের সর্বোচ্চ বার্ষিক সুদহার ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, সুদ কেবল ‘বকেয়া’ বা অনাদায়ি টাকার ওপরই ধরা যাবে, মোট বিলের ওপর নয়।

মাশুল বা ফি আদায়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। কার্ড সচল বা অ্যাকটিভেট করার আগে গ্রাহকের কাছ থেকে কোনো ধরনের ফি নেওয়া যাবে না। বিল পরিশোধে বিলম্ব হলে ‘বিলম্ব ফি’ বা লেট ফি মাত্র একবারই আরোপ করা যাবে। এ ছাড়া সুদের হার বা অন্য কোনো চার্জ পরিবর্তনের অন্তত ৩০ দিন আগে গ্রাহককে তা লিখিতভাবে জানাতে হবে। কেনাকাটার ক্ষেত্রে সুদহীন সুবিধা বজায় থাকলেও নগদ অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রথম দিন থেকেই সুদ কার্যকর হবে।

কার্ডের বাজারে মধ্যবিত্তের দাপট

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ইস্যুকৃত ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭ হাজার ৮৩৩। এর মধ্যে সক্রিয় কার্ডের সংখ্যা ১৮ লাখ ৯৭ হাজার। কার্ডের বাজারে বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে সিটি ব্যাংক। ব্যাংকটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার বলেন, “আমাদের কার্ড গ্রাহকদের একটি বড় অংশই মধ্যবিত্ত। প্রায় অর্ধেক গ্রাহকের মাসিক আয় ৬০ হাজার টাকার নিচে এবং ২০ শতাংশ গ্রাহকের আয় ১ লাখ টাকার বেশি। ব্যাংকের গ্রাহক ও লেনদেন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি মানুষের আগ্রহ যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে এই বাজার আরও বড় হবে।”

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে নারী ও পুরুষের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। মোট গ্রাহকদের মধ্যে পুরুষ ২০ লাখ ৩৬ হাজার এবং নারী ৫ লাখ ৭১ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ৭৭ শতাংশ গ্রাহকই পুরুষ। লেনদেনের চিত্রে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের ভেতরে ৩ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা এবং বিদেশে ৩৩২ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে।

হয়রানি বন্ধে কড়া নির্দেশ

বকেয়া টাকা আদায়ের নামে গ্রাহককে মানসিক বা শারীরিক হয়রানি করা এখন থেকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক বা তাদের নিয়োজিত রিকভারি এজেন্ট পাওনা আদায়ের জন্য গ্রাহককে হুমকি দিতে পারবে না। এমনকি গ্রাহকের পরিবার, বন্ধু বা রেফারেন্স দেওয়া ব্যক্তিদের কোনোভাবেই বিরক্ত করা যাবে না। যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফোন কল বা সরাসরি যোগাযোগ শুধু অফিস চলার সময়ই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এ ছাড়া গ্রাহকের নিরাপত্তার জন্য কার্ড হারিয়ে গেলে তা দ্রুত ব্লক করতে ব্যাংকগুলোকে ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন চালু রাখতে হবে।

কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা ও ইতিহাস

নতুন নীতিমালায় ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন ১৮ বছর হলেই যে কেউ ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরাও তাদের অভিভাবকদের অধীনে ‘সাপ্লিমেন্টারি’ কার্ড ব্যবহার করতে পারবে। আবেদনকারীর অবশ্যই ই-টিন সনদ থাকতে হবে এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্টে কোনো খেলাপি তথ্য থাকা চলবে না।