শান মাসুদের সংবাদ সম্মেলন চলাকালীনও সবার দৃষ্টি অন্যদিকে চলে গেল। পাকিস্তানি অধিনায়কের সঙ্গে তাঁর দেশীয় সাংবাদিকের মাতৃভাষায় চলা দীর্ঘ কথোপকথন স্থানীয় সাংবাদিকদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল। এর ওপর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সংবাদকক্ষে তখনই প্রবেশ করলেন নাজমুল হোসেন দর্শকের আসনে বসে।
জয়ী দলের অধিনায়ক এবং ম্যাচসেরাও তিনি। খেলার সাদা পোশাক এখনও না খুলে নাজমুল শান্ত ও ধীরস্থির ছিলেন। শান মাসুদের প্রশ্নের সারিতে অপেক্ষমাণ অনেকেই এদিকে ফিরে এলেন, কেউ কেউ এগিয়ে এসে বাংলাদেশ অধিনায়কের অটোগ্রাফ নিলেন। গম্ভীর মুখে নাজমুল অটোগ্রাফ দিয়ে গেলেন।
এই গম্ভীরতা বিজয়ের দিনের উপযুক্ত অলংকার। সাধারণত জয় উৎসবে হাসি-আনন্দ-উল্লাসের আমেজ থাকে, কিন্তু অতৃপ্তির ছায়া পড়লে সেগুলো ম্লান হয়। নাজমুলের শান্ততা সম্ভবত এই অতৃপ্তির জন্যই।
নাজমুলের ম্যাচসেরার পুরস্কার তিনটি অর্জনের যোগফল। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরি, দ্বিতীয় ইনিংসের সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগানো ৮৭ রান এবং অবশ্যই দূরদর্শী অধিনায়কত্ব। এখানেই তাঁর অতৃপ্তিও লুকিয়ে আছে—সেঞ্চুরিটা ডাবল হলো না, ৮৭ রান সেঞ্চুরি হয়নি!
শান মাসুদ চলে যাওয়ার পর উত্তরদাতার আসনে বসেও নাজমুলের কথায় উচ্ছ্বাসের চিহ্ন নেই। নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ, তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ, মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক—সবাইকে প্রশংসা করলেও তাঁর কণ্ঠে যেন অভিমানের ছাপ। নিজেকে আয়নায় পুরোপুরি দেখতে না পাওয়ার যন্ত্রণা।
তাঁর ব্যাটিং নিয়ে উদ্দীপনামূলক প্রশ্নেও উত্তেজিত না হয়ে অভিনন্দনগুলো মৃদু প্রত্যাখ্যান করলেন নাজমুল। তাঁর মুখেই শুনুন, “আমার মনে হয় প্রথম ইনিংসে ইনিংসটা বড় হতে পারত। উইকেটটা অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল, বিশেষ করে প্রথম দুই-তিন ঘণ্টা। তারপরও আমার মনে হয় ইনিংসটা আরেকটু বড় হতে পারত।”
দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি না হওয়ার আক্ষেপ সরাসরি প্রকাশ করেননি। পঞ্চম দিনের উইকেটে ব্যাটিংয়ের কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন হয়তো। তবে শেষে আবার বললেন, “আমি বলব যে প্রথম ইনিংসটা আরেকটু বড় হতে পারত।”
একটু পর আরেক প্রশ্ন—‘আপনি তো দারুণ ফর্মে আছেন, খেলাটা কেমন উপভোগ করছেন?’ নাজমুল তবু উচ্ছ্বাস দেখালেন না। শুধু সবার সঙ্গে ব্যাটিং উপভোগ করার কথা বললেন। নিজেকে নিয়ে কোনো বাড়তি উত্তেজনা নেই, এমনকি স্যার ডন ব্রাডম্যান বা জর্জ হেডলির তুলনাতেও।
ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের প্রসঙ্গ উঠতেই বিনয়ের হাসিতে বললেন, “আপনি যে দুইটা নামের কথা বলেছেন, তা আমার সঙ্গে যায় না একদম। মানে মাফ করে দেন আমাকে।”
তবে দল নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস অপরিসীম। টেস্ট জয়ের সব অস্ত্রই যেন একসঙ্গে কাজ করছে—পেস-স্পিন বোলিংয়ে সমান ধার, টপ অর্ডারের ব্যর্থতা কন্ডিশনের জন্য বলে ধরলে ব্যাটিংও ভালো। প্রথম ইনিংসে ৪১৩, দ্বিতীয় ইনিংসে ২৬৭ রানের লিড—এসব উদাহরণ সামনে।
পঁচিশ মিনিটের সংবাদ সম্মেলন শেষে ড্রেসিংরুমের দিকে যেতে যেতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন নাজমুল, “অবশ্যই এটা স্বস্তির এবং আনন্দের। আমাদের যে অপশনগুলো আছে, যেকোনো সময় যেকোনো জায়গা থেকে সাপোর্ট পাচ্ছি। ওপেনার বা টপ অর্ডাররা একটু থিতু হতে পারলে এটা আরও বাড়বে।”
শান্ত নাজমুলের চিত্ত অন্তত দল নিয়েই আনন্দিত। অধিনায়ক হিসেবে আনন্দের সীমা হয়তো সেখানেই সীমাবদ্ধ।






