অতীতের গল্প পড়ার অনেক পথ রয়েছে। কখনো তারিখ, দলিল বা স্মৃতিকথার মাধ্যমে, আবার কখনো একটি ছবির মধ্য দিয়ে। এই ছবিগুলো সময়ের সীমা অতিক্রম করে বাস্তবতা, আবেগ ও ঘটনার ভার বহন করে। এই ধারাবাহিকে আমরা বিশ্ববিখ্যাত এমন একেকটি আলোকচিত্রের গভীর ইতিহাস তুলে ধরব।

চার বছরের নাৎসি শাসনের পর ১৯৪৪-১৯৪৫ সালে বিশাল যৌথ অভিযানের ফলে ফ্রান্স মুক্ত হয়। এই স্বাধীনতা শুরু হয় ডি-ডে অবতরণ দিয়ে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমুদ্রপথে সামরিক অবতরণ অভিযানে মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা নরম্যান্ডির তীরে নামে এবং তীব্র লড়াইয়ে অগ্রসর হয়।

সৈন্যরা উপকূল থেকে এগোচ্ছিলেন, তখন দেশের ভিতরে সাধারণ ফরাসিরা ও প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্যরা গোপনে সাহায্য করছিলেন। তারা শত্রুর রসদ লাইন ভেঙে তথ্য মিত্রবাহিনীকে পাঠাতেন।

১৯৪৪ সালের আগস্টে প্যারিস মুক্ত হয়। শহরে আনন্দোৎসব ও শোভাযাত্রা শুরু হয়, যদিও শীতকালে পাহাড়ি অঞ্চল ও জার্মান সীমান্তে যুদ্ধ চলছিল। ধীরে ধীরে শহর-গ্রাম পুনরুদ্ধার হয় এবং ১৯৪৫ সালের মে জার্মানি আত্মসমর্পণ করলে ফ্রান্স স্বাধীন হয়।

ফ্রান্সের স্বাধীনতা সাধারণত আনন্দ, উদযাপন ও নাৎসি দখল থেকে মুক্তির স্মৃতি। কিন্তু উৎসবের আড়ালে ছিল অন্ধকার অধ্যায়—‘ইপিউহাসুম সোভাজ’ বা ‘ওয়াইল্ড পিউরিফিকেশন’, অর্থাৎ ‘বন্য শুদ্ধি অভিযান’। এ সময় সাধারণ ফরাসিরা নিজেরাই যারা যুদ্ধে জার্মানদের সহযোগিতা করেছিল তাদের শাস্তি দিতে শুরু করে। অপরাধীদের মধ্যে ছিল নারী-পুরুষ উভয়। পুরুষদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক-সামরিক সহযোগিতার অভিযোগ, কিন্তু নারীদের জন্য ছিল বিশেষ অপমানজনক শাস্তি।

এই অপমান প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় ‘হরাইজন্টাল কলাবোরেশন’। অর্থাৎ জার্মান সৈন্যদের সঙ্গে প্রেম বা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, এমন অভিযোগে অভিযুক্ত নারীদের শাস্তি হিসেবে প্রকাশ্যে তাঁদের মাথার চুল কেটে ফেলা হতো, যা পরিচিত ছিল ‘লা তোঁত’ নামে।

‘হরাইজন্টাল কলাবোরেশন’ নামে এই অপমানে জার্মান সৈন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে নারীদের মাথার চুল প্রকাশ্যে কেটে ফেলা হতো, যা ‘লা তোঁত’ নামে পরিচিত।

জার্মান দখলের সময় চরম দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটে অনেক নারী জার্মানদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে খাবার জোগাড় করতেন। লাখ লাখ ফরাসি পুরুষ যুদ্ধবন্দী ছিলেন, জার্মানরা বাড়িতে থাকতেন—এমন পরিস্থিতিতে কখনো আবেগের সম্পর্কও গড়ে উঠত। কিন্তু জার্মানরা চলে যাওয়ার পর এই নারীদের দেখা হতো জাতীয় বিশ্বাসঘাতক হিসেবে।

মাথা কামানো ছিল প্রকাশ্য শাস্তি, অপমানকে চরমে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রতিরোধ যোদ্ধা বা ক্ষুব্ধ জনতা নারীদের বাড়ি থেকে টেনে চত্বরে নিয়ে শত শত মানুষের সামনে চুল কেটে কামিয়ে দিত। চুল কাঁচি দিয়ে কেটে ক্ষুরে কামানো হতো। অনেকে শুধু অন্তর্বাসে ট্রাকে করে শহরে ঘুরানো হতো, গায়ে কালি-স্বস্তিকা আঁকা হতো, আলকাতরা-লিপস্টিকে চিহ্নিত করা হতো। এভাবে নারীত্ব অপমানিত করে সমাজে চিহ্নিত রাখা হতো।

এটাকে জটিল মানসিক মুক্তির প্রক্রিয়া বলা যায়। দীর্ঘ দখলের পর অপমানিত সমাজ নারীদের মাধ্যমে শক্তি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। যারা যুদ্ধে চুপ ছিলেন বা সহযোগিতা করেছিলেন, তারা এতে অংশ নিয়ে দেশপ্রেম প্রমাণ করতে চেয়েছিল। ফলে পক্ষপাতদুষ্ট বিচার হয়, যেখানে নারীদের ব্যক্তিগত জীবন শাস্তির আওতায় আসে। কিন্তু নাৎসিদের সঙ্গে ব্যবসা করে লাভবান পুরুষরা প্রায়ই বেঁচে যান।

১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ২০ হাজার নারীর মাথা কামানো হয়। পরে অস্থায়ী সরকার আইনব্যবস্থা চালু করলে এই সহিংসতা বন্ধ হয়। কিন্তু মানসিক ক্ষত বহুদিন থেকে যায়। এই ছবিগুলো ফরাসি ইতিহাসে ভীতিকর স্মৃতি।

এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের পর প্রতিশোধ দুর্বলদের লক্ষ্য করে, জাতীয় মর্যাদার নামে প্রতিবেশীরা বিচারক হয়ে ওঠে।

খ্যাতিমান আলোকচিত্রী রবার্ট কাপা শার্ত্র শহরে এই উত্তাল সময়ে ছিলেন, উদ্দেশ্য সময়কে ছবিতে ধরা। তিনি বলতেন, ‘যদি আপনার ধারণ করা আলোকচিত্র যথেষ্ট ভালো না হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আপনি যথেষ্ট কাছ থেকে আলোকচিত্রটি ধারণ করেননি।’ তিনি খুব কাছ থেকে ছবি তুলতেন, জনতার মাঝে দাঁড়িয়ে। ফলে ‘দ্য শেভড ওম্যান ইন শার্ত্র’ ছবিটি দর্শককে অস্বস্তিকর মুহূর্তে নিয়ে যায়।

কাপার অধিকাংশ ছবিতে সৈন্যদের সাহস দেখা যায়, কিন্তু এখানে মানুষের অন্ধকার দিক। এটি দেখিয়ে দেয় মুক্তি নৈতিক বিজয় নয়, বিশৃঙ্খলা ও নিষ্ঠুর প্রতিশোধ। ক্ষমতার শূন্যতায় বিচার-প্রতিশোধের সীমা মুছে যায়। ছবিতে লজ্জা জনতার দিকে ফিরে আসে।

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র সিমোন তুসো। নির্বাক দৃষ্টিতে হাঁটছেন, কোলে সন্তান আঁকড়ে। চারপাশে জনতার বিদ্রূপ, হাসি, উল্লাস—পুরুষ, নারী, শিশু সবাই। দখলের আহত অহংকার এক অসহায় নারীর ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে।

তুসোর কোলের শিশুটি করুণ মাত্রা যোগ করে—মায়ের অপরাধের প্রমাণ কিন্তু নির্দোষ সাক্ষী।

‘দ্য শেভড ওম্যান ইন শার্ত্র’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ছবি। এটি প্রতিরোধের রোমান্টিক ধারণা ভাঙে, দেখায় যুদ্ধশেষ নতুন ভুক্তভোগী তৈরি করে।

কাপার এই ছবি জনতার মনস্তত্ত্ব বোঝার দলিল। যুদ্ধকালীন শাস্তির লিঙ্গভিত্তিক প্রকৃতি ও পক্ষপাতের অস্বস্তিকর সাক্ষ্য।