১৯৩০ সালে মন্টেভিডিওর ধূসর বিকেলে বিশ্বকাপের মহাযাত্রা শুরু হয়। আজ শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এই যাত্রা, যেখানে পেলে-গারিঞ্চার সাম্বার ছন্দ, ম্যারাডোনার জাদুকরি ছোঁয়া, জিনেদিন জিদান বা লিওনেল মেসির অমরত্বের পথ—সব মিলে ফুটবলের পুরাণ গড়ে উঠেছে। ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতি ফিরিয়ে আনার আয়োজন—ফিরে দেখা বিশ্বকাপ।

দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ইউরোপে চলে আসে, আয়োজক ইতালি। ফ্যাসিবাদী শাসক বেনিতো মুসোলিনি ফিফার ওপর চাপ দিয়ে নানা কৌশলে নিশ্চিত করেন ইতালি শিরোপা জিতবে। ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতালি প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। এই জয়কে জাতীয়তাবাদী প্রচারণার হাতিয়ার করা হয়। খেলোয়াড়দের হুমকি দেওয়া হয়, ফ্যাসিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। বিজয়ী দলকে দেওয়া হয় অতিরিক্ত এক ট্রফি—‘কোপা দেল দুচে’ (নেতার বিশ্বকাপ)।

শোনা যায়, ইতালি জাতীয় দলের কোচ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়—সবাইকে বেনিতো মুসোলিনি হুমকি দিয়েছিলেন—হয় বিশ্বকাপ জিতবে, নয়তো মরবে! জিতলে আলাদা ট্রফি দেওয়ার আগাম ঘোষণাও দেন। নিজেদের শক্তি বাড়াতে চার আর্জেন্টাইন ও এক ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারকে দলে ভিড়ানো হয়। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা এই ফুটবলারদের তখন বলা হতো ‘ওরিউন্দি’।

এই আসরে দুই বড় নাম অনুপস্থিত—উরুগুয়ে ও ইংল্যান্ড। উরুগুয়ে আগের আসরে ইতালির অনুপস্থিতির প্রতিশোধে অংশ নেয়নি, এটি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ছাড়া একমাত্র বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপকে পাত্তা না দিয়ে অনুপস্থিত, তারা নিজেদের ফুটবলীয় আভিজাত্যে বুঁদ ছিল, ১৯৫০ সালের আগে ময়দানে পা রাখেনি।

এই বিশ্বকাপে প্রথমবার চালু হয় বাছাইপর্ব। আয়োজক ইতালিকেও বাছাইপর্ব খেলতে হয়, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র। টুর্নামেন্ট সরাসরি নকআউট ফরম্যাট, ১৬টি দলের মধ্যে আটটি প্রথম ম্যাচেই বাড়ি ফেরে। বাছাইপর্বে ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় পরিবর্তন (সাবস্টিটিউশন) নিয়ম পরখ করা হয়। মূল পর্বে অস্ট্রিয়া-ফ্রান্স ম্যাচে প্রথম অতিরিক্ত সময়ের খেলা দেখা যায়।

লাতিন আমেরিকা থেকে ইউরোপে যাওয়া সহজ ছিল না। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা প্রায় দুই সপ্তাহ জাহাজ ভ্রমণ করে ইতালিতে পৌঁছে, কিন্তু এক ম্যাচ হেরেই তিন দিন পর ফিরতি জাহাজ ধরে। মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র একই জাহাজে রোমে পৌঁছে, কিন্তু মূল টুর্নামেন্টের তিন দিন আগে বিশেষ বাছাই ম্যাচ খেলে। যুক্তরাষ্ট্র ৪-২ গোলে মেক্সিকোকে হারিয়ে জায়গা পায়, কিন্তু প্রথম ম্যাচেই ইতালির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নেয়।

১০ জুন, ১৯৩০। রোমের নাজিওনালে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে আছেন মুসোলিনি। চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ফাইনাল। রেফারি ইভান একলিন্দ ইতালির প্রতি কিছুটা বেশি উদার ছিলেন। জনশ্রুতি আছে, আগের রাতে মুসোলিনির সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থেকে বিরতিতে মুসোলিনি ড্রেসিংরুমে গিয়ে খেলোয়াড়দের ধমক দেন। নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে ড্র থেকে অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেলো শিয়াভিওর গোলে ২-১ ব্যবধানে ইতালি জয়ী হয়।

ফাইনালের সমতাসূচক গোলটি করেন আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত রাইমুন্দো ওরসি। পরের দিন আলোকচিত্রী সেই গোলের ছবির জন্য ওরসিকে মাঠে নিয়ে একই জায়গা থেকে শট নিতে বলেন। ওরসি টানা ২০ বার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো বলই জালের সেই কোণ দিয়ে ঢুকল না।