১৮ ডিসেম্বর, ২০২২। রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) আঙিনায় বড় পর্দায় চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি প্রথম গোলটি করলেন। হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন, ‘গো...ল’।
বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপের এই উন্মাদনা কোনো নতুন নয়। তবে ২০২২ সালে এটি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফারও নজরে এসেছিল। ঢাকার উন্মাদনার কয়েকটি ছবি তাদের ফেসবুক পেজে শেয়ার করে ফিফা লিখেছিল, ‘ফুটবলের মতো আর কোনো কিছুই মানুষকে একত্রে নিয়ে আসে না।’
চার বছর পর আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে পর্দা উঠবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। কিন্তু বাংলাদেশে এবার খেলা দেখা যাবে কি না, সে নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ২০২৬ বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব এখনো কিনতে পারেনি। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বা ওটিটি প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বত্ব কেনেনি। ফলে খেলা দেখানো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
২০২২ সালে নাগরিক টিভি বিশ্বকাপ দেখিয়েছিল। এই চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান কামরুজ্জামান বাবু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দেশে টিভি চ্যানেল বা ওটিটি খেলা না দেখালে মানুষ খেলা দেখতে পারবে না। কারণ, বিদেশি চ্যানেলগুলো অনুমোদনপ্রাপ্ত দেশের বাইরে খেলা সম্প্রচার করতে পারবে না বলে নিয়ম করে দিয়েছে ফিফা। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে খেলা দেখানোর জন্য কেউ সম্প্রচার স্বত্ব কেনেনি।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড’। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কাছ থেকে স্বত্ব কিনতে হবে।
বিটিভির দায়িত্বশীল একটি সূত্র মুক্তকণ্ঠকে বলেছে, সম্প্রচার স্বত্ব বাবদ সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫১ কোটি টাকা চেয়েছে। করসহ তা ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। শর্ত অনুযায়ী এই অর্থের ৫০ শতাংশ ১০ মে মধ্যে এবং বাকিটা ১০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এই প্যাকেজে উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানসহ ১০৪টি ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার ও হাইলাইটস দেখানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলে স্বত্ব কেনে এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার করে বিজ্ঞাপন থেকে আয় করে।
বিটিভি সূত্র বলছে, ২০১৮ সালে ‘প্যাকেজ নীতিমালা’ আওতায় কোনো খরচ ছাড়াই বিশ্বকাপ দেখিয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালে নীতিমালা বাতিল হওয়ায় শেষ মুহূর্তে সরকারের সিদ্ধান্তে ‘বিশেষ বাজেটে’ ৯৮ কোটি টাকা খরচ করে স্বত্ব কিনেছিল।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, স্প্রিংবক প্রথমে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মন্ত্রণালয় প্রস্তাব বিটিভির কাছে পাঠায়। গত এপ্রিলে বিটিভি স্প্রিংবকের কাছে মূল্য জানতে চায়। তখন ১৫০ কোটি টাকা চাওয়া হয়।
বিটিভি সূত্রের দাবি, এত খরচ দেখে মন্ত্রণালয় ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত দুটি ই-মেইল পাঠায় বিটিভি। কিন্তু ফিফা কোনো জবাব দেয়নি। ফলে খেলা দেখানো অনিশ্চিত।
বিটিভির ই-মেইল নিয়ে ফিফার মিডিয়া বিভাগে মঙ্গলবার ই-মেইল করেছে মুক্তকণ্ঠ। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জবাব আসেনি। তবে রয়টার্সের ৪ মে প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চীন ও ভারতেও বিশ্বকাপ দেখানো নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রতিবেদনে ফিফার বিবৃতি উদ্ধৃত হয়েছে: ‘২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির বিষয়ে চীন ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এ পর্যায়ে এ-সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা প্রয়োজন।’
বেসরকারি খাতে অনাগ্রহ
২০২২ সালে সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা এবার উদ্যোগ নিচ্ছে না। বেসরকারি খাতে কেউ জোরালো চেষ্টা করছে না। যুক্তি, খেলা গভীর রাতে ও ভোরে হবে, দর্শক কম থাকবে এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়।
২০২২-এ টফি ডিজিটাল স্ট্রিমিং করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বত্ব কেনা নিয়ে সিদ্ধান্তহীন।
তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে বলেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচার নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বুধবার একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক রয়েছে। বৈঠকের অ্যাজেন্ডায় এই বিষয়টি রয়েছে।’
মূল্য নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী স্প্রিংবক
স্প্রিংবকের প্যাকেজে টেলিভিশন, রেডিও, মুঠোফোন ও ইন্টারনেট সম্প্রচারের স্বত্ব রয়েছে। গত সোমবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, তারা ফিফার কাছ থেকে উচ্চমূল্যে স্বত্ব কিনেছে।
বিটিভির বিষয়ে তিনি বলেন, বিটিভিকে মূল্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু পাল্টা প্রস্তাব আসেনি। এখনো আলোচনার সুযোগ আছে। ফুটবলপ্রেমীদের কথা বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য হারে স্বত্ব দিতে রাজি।
বিশ্বকাপ আর মাত্র এক মাস বাকি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত আলোচনা না করলে মানুষ বঞ্চিত হবে। এখানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি ফাহাদ করিম বলেন, ‘আমরা ফুটবল লাভিং নেশন (ফুটবলপ্রেমী জাতি)। এখানে বিশ্বকাপ দেখানো হবে না, এটা তো চিন্তাই করা যায় না।’ তিনি বলেন, ‘ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আমরা অবশ্যই আশা করব, যেকোনো মাধ্যমে হোক বিশ্বকাপ বাংলাদেশে দেখানো হবে। সেটা সরকার হোক, বেসরকারি হোক, যেভাবেই হোক না কেন; বিশ্বকাপ দেখাতেই হবে বাংলাদেশে।’






