ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আলী আল-সামুদি তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গুলিবিদ্ধ তাঁকে সামলাতে চিকিৎসকেরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় তাঁর সহকর্মী শিরিন আবু আকলেহর মৃতদেহ হাসপাতালে আনা হয়।
২০২২ সালের ১১ মে পশ্চিম তীরের জেনিন শরণার্থীশিবিরে সংবাদ সংগ্রহের সময় আল-জাজিরার সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ গুলিতে নিহত হন। একই ঘটনায় আলী আল-সামুদি আহত হন।
আল-সামুদি আল-জাজিরাকে ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি পাশ ফিরে শিরিনকে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমি চিৎকার করছিলাম, তাঁর কাছে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু আমাকে যেতে দেওয়া হয়নি।”
মাঠের অভিজ্ঞতা থেকে আল-সামুদি বুঝতে পারেন, শিরিন নিহত হয়েছেন।
সেদিন সকালে জেনিন শরণার্থীশিবিরের পশ্চিম পাশে ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালাচ্ছিল। আল-সামুদি ও শিরিনসহ কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে খবর সংগ্রহ করতে যান। তাঁদের গায়ে ‘প্রেস’ লেখা জ্যাকেট ও হেলমেট ছিল।
আলী আল-সামুদি বলেন, সেখানে কোনো ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ছিল না। কোনো সংঘর্ষও চলছিল না।
“আমরা সাংবাদিকেরা আলাদা ছিলাম। সেনাদের কাছাকাছি গিয়ে নিরাপদ জায়গা থেকে খবর সংগ্রহ করতে চেয়েছিলাম,” বলেন তিনি।
হঠাৎ গুলির শব্দ শোনা যায়। আল-সামুদি বলেন, তিনি শিরিনকে পেছনে সরে যেতে বলছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর পিঠে গুলি লাগে।
আরও বলেন, “আমি ঘুরে দাঁড়ানোয় গুলিটি পিঠে লাগে। সম্ভবত সেনারা আমাকে বুকে গুলি করতে চেয়েছিল।”
শিরিনের শেষ কথা ছিল, “আলী আহত হয়েছে।” এরপর স্নাইপার থেকে অনবরত গুলি চলতে থাকে। শিরিন একটি দেয়ালের পাশে আশ্রয় নিলেও রক্ষা পাননি। হেলমেট ও জ্যাকেটের মাঝখানের সামান্য উন্মুক্ত স্থানে—ঘাড়ে গুলি লাগে। আল-সামুদি বলেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
শিরিন আবু আকলেহ ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। আরব বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আল-জাজিরা ঘটনাটিকে ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যা’ বলে বর্ণনা করেছিল।
চার বছরেও বিচার হয়নি
শিরিন আবু আকলেহ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন। আরব বিশ্বে তিনি পরিচিত মুখ। তাঁর মৃত্যুর পর আল-জাজিরা ঘটনাকে ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যা’ বলে বর্ণনা করেছিল।
গতকাল সোমবার তাঁর হত্যার চার বছর পূর্ণ হয়েছে।
এর মধ্যে গাজা, লেবানন ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলায় শত শত সাংবাদিক এবং ১০ জনের বেশি মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। কিন্তু কোনো ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার বা অভিযুক্ত করা হয়নি।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, শিরিন হত্যার বিচার না হওয়ায় ইসরায়েল আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
আলী আল-সামুদি বলেন, “শিরিন হত্যার বিচার না হওয়াই আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পথ তৈরি করেছে। সাংবাদিকদের পরিকল্পিত ও ব্যাপক হত্যার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।” তাঁর ভাষায়, “এখন ইসরায়েল খুব সহজেই বলে দেয়, তারা সাংবাদিকদের হত্যা করছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
আল-সামুদি বলেন, শিরিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় তাঁর হত্যার বিচার নিশ্চিত করার বিশেষ দায়িত্ব ওয়াশিংটনের ছিল।
প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বিপুল সামরিক সহায়তা দেয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে কূটনৈতিক সমর্থন দেয়।
আল-সামুদি বলেন, শিরিন হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো শত শত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা পেত।
আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের প্রধান জেমস জগবি বলেন, এখানে ভূমিকা রাখার ক্ষমতা একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই আছে। কিন্তু তারা সেই প্রভাব ব্যবহার করছে না।
২০২২ সালের শেষ দিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, শিরিন হত্যার ঘটনায় এফবিআই তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু চার বছর পরও সেই তদন্তের কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি।
আল-সামুদি বলেন, তাঁকে মাত্র একবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
‘অস্বীকার, বিভ্রান্তি, ধামাচাপা’
শিরিন নিহত হওয়ার পর তৎকালীন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট প্রথমে দাবি করেন, ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন। পরে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হলে ইসরায়েল তদন্ত শুরুর কথা জানায়।
একই বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, ইসরায়েলি গুলিতেই ‘অনিচ্ছাকৃতভাবে’ শিরিন নিহত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তদন্তে দেখা যায়, শিরিনকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছিল।
জেমস জগবি বলেন, “ইসরায়েলের কৌশলটা একই রকম—প্রথমে অস্বীকার করা, তারপর অন্যের ওপর দোষ চাপানো, শেষে তদন্তের কথা বলা।” তাঁর মতে, এটি দায় এড়ানোর পুরোনো কৌশল।
জেমস জগবি আরও বলেন, এভাবে বারবার পার পাওয়ায় তাদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর দেশ
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, গত কয়েক বছরে সাংবাদিক হত্যার ক্ষেত্রে ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
অনেক ঘটনায় ইসরায়েলি বাহিনী নিজেরাই সাংবাদিক হত্যার ভিডিও প্রকাশ করেছে। পরে দাবি করেছে, ওই সাংবাদিকেরা ফিলিস্তিনি বা লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন। যদিও এসব দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গাজায় আল-জাজিরার ১২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইসমাইল আল-গুল ও আনাস আল-শরিফের মতো পরিচিত মুখ। পশ্চিম তীরেও সাংবাদিকদের ওপর চাপ বেড়েছে।
ফিলিস্তিনি বন্দীবিষয়ক সংগঠন প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটির তথ্যমতে, বর্তমানে ৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইসরায়েলের কারাগারে আছেন।
আলী আল-সামুদি এক বছর ইসরায়েলি প্রশাসনিক আটকাদেশে বন্দী ছিলেন। এ সময় তিনি নির্যাতনের শিকার হন এবং ওজন অনেক কমে যায়। তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে সাংবাদিকেরা এখন সেনাবাহিনীর নয়, সশস্ত্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদেরও হুমকির মুখে।
তাঁর ভাষায়, সাংবাদিকদের ওপর হামলা হচ্ছে, চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে, মারধর ও গুলির ঘটনা ঘটছে।
ফিলিস্তিনি বন্দীবিষয়ক সংগঠন প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স সোসাইটির তথ্যমতে, বর্তমানে ৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইসরায়েলের কারাগারে আছেন।
আলী আল-সামুদি বলেন, “তারা আমাদের কাজ থামিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আমরা বলে এসেছি, বলবও—সংবাদ সংগ্রহ চলবে। শিরিন আবু আকলেহর কণ্ঠ কখনো স্তব্ধ হবে না।” তিনি বলেন, “শিরিন শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না; তিনি সাংবাদিকতা, মানবিকতা ও নৈতিকতার এক অনন্য উদাহরণ ছিলেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর কাছ থেকে শিখবে।”






