প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রতি মনোনিবেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ট্রান্সফর্মিং হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্সি’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষা ও গবেষণায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে পারছে কি না, এমন একটি প্রশ্ন অনেকের আলোচনায় ফুটে উঠেছে। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে র্যাঙ্কিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।’ তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত গবেষণা, প্রকাশনা, সাইটেশন ও উদ্ভাবন—এই বিষয়গুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কোথায়, এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিদগণ নিশ্চয় আরও চিন্তাভাবনা করবেন। শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে।’
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে পা দিয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চলমান এই সময়ে এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস ও অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডেটা, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজি, পঞ্চম প্রজন্মের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি—এসব উন্নততর প্রযুক্তি একদিকে আমাদের চিন্তার জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্যদিকে শাসন করছে মানুষের কর্মক্ষেত্র বা কর্মসংস্থান। এর ফলে নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহার প্রথাগত চাকরির বাজারে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে যেমন, তেমনি তৈরি করছে নিত্যনতুন কর্মসংস্থানও।’
তারেক রহমান বলেন, ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কর্মসংস্থানের নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হলে আমাদেরকে মুখস্থ বিদ্যা ও সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের প্রচলিত ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।’
শিক্ষাক্রম সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হন, কিন্তু উচ্চশিক্ষা সত্ত্বেও অনেকে বেকার থাকেন। এর মূলে দক্ষতার অভাব। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়। সময়োপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এ কারণেই বর্তমান সরকার একাডেমিক সিলেবাসকে সময়োপযোগী করার কাজ শুরু করেছে।’
উচ্চশিক্ষাকে সময়োপযোগী করতে সরকার এন্টারপ্রেনিউরশিপ, ইন্টার্নশিপ ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভাগীয় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থানীয় শিক্ষা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতেকলমে দক্ষতা অর্জন করবে এবং বেকারত্ব এড়াতে পারবে। তিনি বলেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া বাণিজ্যিকীকরণের জন্য সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট দেওয়া হচ্ছে, যাতে ক্যাম্পাস থেকে উদ্যোক্তা তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, শিক্ষার্থী অবস্থায় দক্ষতা অর্জনে তারা চাকরির অপেক্ষা না করে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন। সরকার উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, সায়েন্স পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বে বিজ্ঞান মেলা, ইনোভেশন ফেয়ারসহ আয়োজন উৎসাহিত হবে। স্কুলপর্যায় থেকে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে।
ব্রিটিশ লেখক টম উইনের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজকের এই কর্মশালার বিষয়বস্তুর সঙ্গে ব্রিটিশ লেখক টম উইন যিনি বিশেষ করে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে “বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট অ্যান্ড অ্যানালিস্ট” হিসেবে স্বনামধন্য, তাঁর একটি বিখ্যাত মন্তব্য বেশ প্রাসঙ্গিক বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে।’ উদাহরণ দিয়ে বলেন, উবারের কোনো ট্যাক্সি নেই, ফেসবুক কনটেন্ট তৈরি করে না, আলিবাবার মজুত নেই, এয়ারবিএনবি’র রিয়েল এস্টেট নেই—তবু ইনোভেটিভ আইডিয়ায় তারা বিশ্ব জয় করেছে। এগুলো ‘স্মার্ট ইন্টারফেস’ যা সেবাদাতা ও গ্রহীতাকে যুক্ত করে।
শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবন কিংবা গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকার অর্থ বরাদ্দ দেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি জানি, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই, তাদের অনেকেই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের “গবেষণা ও উদ্ভাবন” কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বর্তমানে যাঁরা দেশ-বিদেশে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও অর্থ-বিত্তে প্রতিষ্ঠিত সেসব অ্যালামনাইকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমি উপস্থিত শিক্ষাবিদদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই।’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ক্রেস্ট উপহার দেন কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে কর্মশালায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষাসচিব আবদুল খালেক, ইউজিসির সচিব ফখরুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন।






