ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছিল ১৯৩০ সালে। মন্টেভিডিওতে অনুষ্ঠিত হয় ফুটবলের বিশ্বকাপের প্রথম আসর। স্বাগতিক উরুগুয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে এই মহাত্যগের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নাম লেখায় ইতিহাসে।

অলিম্পিক ফুটবলে ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের সোনাজয়ী এবং দেশটির সংবিধান প্রণয়নের শতবর্ষ পালন উপলক্ষে আয়োজকের দায়িত্ব দেওয়া হয় উরুগুয়েকে। ফিফার সদস্যদের যাতায়াত ও আবাসনের খরচ বহনের প্রতিশ্রুতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টুর্নামেন্টের ঠিক এক বছর আগে আয়োজক নির্বাচিত হওয়ায় সময়ের সাথে দৌড়ানো ছিল স্বাগতিকদের জন্য চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র একটি মাঠে সব ম্যাচ আয়োজন করতে হয়েছিল। শ্রমিকরা দিনরাত আট ঘণ্টা করে কাজ চালিয়ে বিখ্যাত ‘এস্তাদিও সেন্তেনারিও’ তৈরি করেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, গ্যালারি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয় টুর্নামেন্ট শুরুর পাঁচ দিন পর। এক লাখ দর্শক ধারণক্ষমতা সত্ত্বেও শুরুতে দর্শক ঢুকানো হয় সতর্কতার সাথে।

মহাদেশীয় দূরত্ব ও গ্রেট ডিপ্রেশন বা অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তখন ইউরোপ থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় যাওয়া কষ্টসাধ্য ছিল। মোট ১৩টি দেশ অংশ নেয়—দক্ষিণ আমেরিকা থেকে সাত, উত্তর আমেরিকা থেকে দুই এবং ইউরোপ থেকে চারটি। ইতালি আয়োজক হতে না পারায় প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করেনি। রাজা দ্বিতীয় ক্যারোলের অনুরোধে রোমানিয়া, ফিফার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও যুগোস্লাভিয়া যোগ দেয়। ইউরোপীয় দলগুলো ‘কোন্তে ভার্দে’ নামক বাষ্পচালিত জাহাজে তিন সপ্তাহের সমুদ্রযাত্রা করে পৌঁছায়। ফুটবলাররা ফিটনেস বজায় রাখতে জাহাজের ডেকেই দৌড়াতেন। অন্যদিকে, মিসর দল ভূমধ্যসাগরে ঝড়ের কারণে সংযোগকারী জাহাজ মিস করায় বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি।

প্রথম দিনেই মাঠে নামে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র। মেক্সিকোর বিপক্ষে ৪-১ গোলে জয়ী ফ্রান্সের লুসিঁয়ে লরাঁ বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোল করেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়ী যুক্তরাষ্ট্রের জিম ডগলাস প্রথম ক্লিনশিট পান। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ৬-১ গোলে এবং উরুগুয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একই ব্যবধানে জয়ী হয়। দুই লাতিন পরাশক্তির এই জয়ে ফাইনালে দেখা যায় ‘স্প্যানিশ ভাষী’ দুই দেশের মুখোমুখি লড়াই, যা এখন পর্যন্ত একমাত্র।

ফাইনালকে কেন্দ্র করে মন্টেভিডিওর পরিবেশ উত্তপ্ত ছিল। খুনের হুমকির কারণে আর্জেন্টিনা দলের ফুটবলারদের পুলিশি পাহারায় রাখা হয়। রেফারি জন ল্যাঞ্জেনাস জীবনবিমা ছাড়া মাঠে নামতে অস্বীকার করেন। বল নিয়েও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আর্জেন্টিনা তাদের দেশের বল চাইলে উরুগুয়ে ইংল্যান্ড থেকে আনা বল পছন্দ করে। টসের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বলে এবং বিরতির পর উরুগুয়ের বলে খেলা হবে। প্রথমার্ধে ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে নিজের বলে ৩ গোল করে ৪-২ গোলে জিতে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে উরুগুয়ে।

বিশ্বকাপ জয়ী প্রথম অধিনায়ক হোসে নাসাজ্জির নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁকে ‘দ্য গ্র্যান্ড মার্শাল’ ডাকা হতো। তবে ট্রফিসহ তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক ছবি পাওয়া যায় না। একটি ছবিতে দেখা যায়, ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমে ট্রফি তুলে দিচ্ছেন উরুগুয়ে ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি পল জুদের হাতে। পরদিন উরুগুয়েতে জাতীয় ছুটি পালিত হয়। একই দিনে বুয়েনস আইরেসে উরুগুয়ের দূতাবাসে ক্ষুব্ধ আর্জেন্টাইন সমর্থকরা হামলা চালায়।

সেই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ জীবিত খেলোয়াড় ছিলেন আর্জেন্টিনার ফ্রান্সিসকো ভারালো। তিনি ২০১০ সালে ১০০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।