একঘেয়ে বিন্যাস, সংযত রেখা এবং বিস্তীর্ণ শূন্যতার মধ্যে স্থাপিত একটি ক্ষীণ কিন্তু জীবন্ত উপস্থিতি—‘অপরাজিতা’। এই চিত্রটি দৃশ্যের চেয়ে রূপক হিসেবে বেশি অনুভূত হয়। শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির নির্যাস হিসেবে এর সরলতা বিবেচনাযোগ্য। তিনি বিষয়কে ভেঙে দৃশ্যমান জটিলতা অপসারণ করে অন্তর্নিহিত স্পন্দনে পৌঁছান। ফলে ছবিটি শুধু ফুল বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চিত্রান্ত নয়, নীরবতা, একাকিত্ব ও স্থিরতার বিমূর্ত অনুভূতি হয়ে ওঠে। এছাড়া ‘অপরাজিতা’কে অপরাজয়ের প্রতীক বা পরাজয় না মেনে নেওয়ার রূপক হিসেবেও দেখা যায়, যা ভাবনাকে নাড়া দেয়।
বলছি ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের ‘অপরাজিতা’ চিত্র সম্পর্কে। ১৯৯৭ সালে অঙ্কিত এই চিত্রের নাম থেকেই প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘অপরাজিতা’। প্রদর্শনীতে ১৯৯৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অঙ্কিত বেশ কিছু শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। শিল্পকর্মগুলোর শিরোনামও একটু ভিন্ন—‘কিছু অভিমান’, ‘যদি ভুলে যাও মোরে’, ‘আজি বিজন ঘরে’, ‘ভালো যদি বাস সখী’, ‘এসো আমার ঘরে’, ‘দ্বীপ নেমে মোর বাস্তবায়নে’। এগুলো রবীন্দ্রনাথের ভাব-ভাবনার জগতের দৃশ্যমান রূপ বলে অনুমান করা যায়।
‘অপরাজিতা’র মতো নির্যাসমুখী প্রবণতা পরবর্তী কাজগুলোতেও অব্যাহত। বিশেষ করে প্যাস্টেলে আঁকা ফুলদানি ও ফুলের চিত্রমালা তাঁর স্বাক্ষরধর্মী কাজ। এখানে ফুলগুলো বাস্তবের অনুকরণ নয়, স্মৃতির ভাসমান চিহ্ন। বিভিন্ন আকারের ফুলদানির স্থিরতা এবং ফুলের ক্ষণস্থায়ী সজীবতা মিলে তাঁর ছবির কাব্যিকতা গড়ে ওঠে।
তাঁর কাজে সরলীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ক্যানভাস পুরোপুরি পূর্ণ করেন না, বরং শূন্যতাকে ছবির সক্রিয় অংশ বানান। এই নীরব শূন্যতা দর্শককে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। সেখানে চোখ যত দেখে, তার চেয়ে বেশি অনুভব হয়। এই প্রবণতা সংগীতের বিরতির মতো, যেখানে না-বাজানো অংশও সুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ। সংগীতশিল্পী হিসেবে দেওয়ানের অভিজ্ঞতা তাঁর চিত্রভাষায় এই সূক্ষ্ম ছন্দ এনেছে।
মৃদু টোন, ধূসর আবহ এবং একরঙা বা সীমিত রঙের সংলাপে তাঁর ছবিতে স্বপ্নালু অন্তর্জগৎ তৈরি হয়। আলো এখানে কখনো তীব্র নয়, ছায়াময় কোমলতায় আবৃত। সফট প্যাস্টেলের গুঁড়ো রঙ ক্যানভাসে ধীরে মিলিয়ে যায়, ঠিক গানের শেষ সুরের দীর্ঘ প্রতিধ্বনির মতো। আবার কোনো কাজে তীব্র উজ্জ্বলতা—যেমন সাদা জমিনে লাল রঙের ফুটকি—অপরাজেয় সত্তার মতো নিজেকে প্রকাশ করে।
খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ইফ্ফাত আরা দেওয়ান রবীন্দ্রসংগীতের মতোই বাহ্যিক বর্ণনার চেয়ে অন্তর্গত অনুভূতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ফলে তাঁর চিত্রকর্ম শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়। এই অনুভবের স্থানেই তাঁর শিল্পের স্বাতন্ত্র্য।
‘অপরাজিতা’ প্রদর্শনী তাই শুধু একটি শিল্প-উপস্থাপনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক অন্তর্জাগতিক সাধনার নিরবচ্ছিন্ন প্রতিধ্বনি।
সমসাময়িক শিল্পের বহুমাত্রিক উচ্চারণ ও কৌশলগত জটিলতার মধ্যে ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের কাজ শান্ত, ধীর ও আত্মমগ্ন অভিজ্ঞতা জন্মায়। তিনি চমক সৃষ্টি করেন না, দর্শককে নিয়ে যান ধ্যানমগ্ন অনুভূতির পরিসরে। ‘অপরাজিতা’ প্রদর্শনী তাই শুধু একটি শিল্প-উপস্থাপনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক অন্তর্জাগতিক সাধনার নিরবচ্ছিন্ন প্রতিধ্বনি।
শিল্পাঙ্গনের আয়োজনে গ্যালারি দ্য ইলিউশনসে ১ মে থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী ১৬ মে ২০২৬ পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।






