‘জুতা সেলাই ও কালি কইরা (মুচিগিরি) দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ টেয়া রুজি অয়। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি। এর ওপর অসুস্থ ও বৃদ্ধ মার ওষুধ কিনতেই খরচ মাসে দুই হাজার টেয়া। রুজির টেয়ায় দুই বেলা খাওনই জোটে না। মায়ের ওষুধ কিনি ক্যামনে।’ এসব কথা বলছিলেন চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার লিটন চন্দ্র দাস (৪০)।

তাঁর বাড়ি শীলমন্দি এলাকায়। গত ২৮ বছর ধরে উপজেলা সদর ও আশপাশের এলাকায় হেঁটে এবং ফুটপাতে বসে জুতা সেলাই ও কালি করে জীবনযাপন করছেন লিটন। তিনি শীলমন্দি এলাকার মৃত মাখন চন্দ্র দাসের ছেলে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। অসুস্থ মা, স্ত্রী এবং দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলে তাঁর সংসার।

গত শনিবার সকাল ১০টায় উপজেলা সদরের কলেজ রোডের ফুটপাতে একজনের জুতা কালি করছিলেন লিটন চন্দ্র দাস। কাজের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বাবাও মুচির কাজ করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর তিনিসহ দুই ভাই বাবার পথ বেছে এই পেশায় যোগ দেন। বোনদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। দুই ভাই আলাদা সংসার পালন করছেন। মা ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত। স্ত্রীসহ এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁর পরিবার।

১৯৯৭ সালে ১২ বছর বয়সে এই পেশায় আসেন লিটন চন্দ্র দাস। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে বাড়ি ফেরেন। গড়ে দৈনিক আয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, তবে কিছু দিন ৩৭৫ টাকাও হয়।

১৯৯৭ সালে ১২ বছর বয়সে লিটন চন্দ্র দাস এ পেশায় আসেন। প্রতিদিন সকালে কাজে নামেন, টানা রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করে ফেরেন বাড়ি। প্রতিদিন গড়ে আয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, তবে কোনো কোনো দিন ৩৭৫ টাকাও হয়।

লিটন চন্দ্র দাস বলেন, ঝড়-বৃষ্টিতে ফুটপাতে বসে বা হেঁটে জুতা রং ও সেলাইয়ের কাজ করা সম্ভব হয় না। শরীর অসুস্থ থাকলেও মাঝে মাঝে কাজ বন্ধ পড়ে যায়। মাসে গড়ে ২০ থেকে ২২ দিন কাজ করেন। এই সময়ে আয় হয় ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। অসুস্থ মায়ের ওষুধে মাসে দুই হাজার টাকা খরচ। বাকি টাকায় সংসার চলে না। প্রতি মাসে টাকা ধার করতে হয়। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে। ছেলে-মেয়েকে পড়াতেও পারছেন না। আর্থিক সমস্যায় একমাত্র ছেলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর পড়েনি।

‘বাজারে কাঁচা তরকারি, সয়াবিন তেল, ডিম, চাল, মাছ, মাংসসহ সব জিনিসের দামই এহন চড়া। দোকানে বাকিবকা রাইখা জিনিসপত্র কিনি। মাসের শেষে বাকি শোধ দিয়া আবার বাকিতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (ভোগ্যপণ্য) কিনি। তবে হগল জিনিস বাকিতে পাওয়া যায় না। দোকানিরাও ক্যামন যেন অইয়া গেছে’—হতাশার সুরে বলেন লিটন চন্দ্র দাস।

উপজেলার কলাদী এলাকার বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি লিটনকে ভালোভাবেই চেনেন। তিনি রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল-সন্ধ্যা জুতা সেলাই, পলিশ ও রঙের কাজ করেন মনোযোগ দিয়ে। কারও কাছ থেকে পাওনার এক টাকাও বেশি নেন না। তাঁর কাজ সুন্দর। তিনি খেটে খাওয়া মানুষের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।