কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা জানিয়েছেন বিভিন্ন এনজিও ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলছেন, গত ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা যায়নি। উল্টে গত দুই বছরে নতুন করে আরও দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন। এই পরিস্থিতিতে শিবিরে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি হলে আরও রোহিঙ্গা আসতে উৎসাহিত হতে পারে।
আজ সোমবার দুপুরে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে ‘কক্সবাজারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রোহিঙ্গা ত্রাণ কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন এনজিও কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এই সম্মেলন আয়োজন করে কক্সবাজারের অর্ধশতাধিক এনজিওর জোট ‘সিএসও-এনজিও ফোরাম’ (সিসিএনএফ)।
সিসিএনএফের কো-চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে নতু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো দরকার। সীমান্ত নিরাপদ না হলে কক্সবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রেজাউল করিম চৌধুরী আরও বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আসিয়ান ফোরামে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োজনে আরাকান আর্মির সঙ্গেও আলোচনায় বসতে হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংসদে রোহিঙ্গা–সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জোরালোভাবে উপস্থাপন করার আহ্বান জানান তিনি।
সিসিএনএফের সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পৃথিবীর কোথাও শরণার্থীদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নজির নেই। অথচ উখিয়ায় পাহাড় কেটে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে স্থায়ীভাবে বসবাসের বার্তা যায়। ফলে মিয়ানমার থেকে আরও রোহিঙ্গা আসতে উৎসাহিত হতে পারে। তিনি বলেন, এসব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত প্লাস্টিকনির্ভর উপকরণ পরিবেশবান্ধব নয় এবং ভবিষ্যতে ভয়াবহ বর্জ্য সংকট তৈরি করতে পারে।
বেসরকারি সংস্থা সিইএইচআরডিএফের প্রধান নির্বাহী ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী মো. ইলিয়াস মিয়া বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের জন্য প্রায় আট হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। এতে উখিয়া ও টেকনাফের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলনের ফলে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন নলকূপে পানি শুকিয়ে গেছে, কোথাও কোথাও লবণাক্ত পানি উঠছে।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ সরকারের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই আশ্রয়শিবিরে স্থায়ী ধরনের শেল্টার নির্মাণ করা হচ্ছে।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্যে স্থানীয় চাষিদের অন্তত ৩০০ একর কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে। কিন্তু এসব জমি পুনরুদ্ধারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকা নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
কম্বাইন হিউম্যান রাইটস ওয়ার্ল্ডের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি রবিউল হাসান বলেন, ভেন্ডরশিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। বর্তমানে কক্সবাজারে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।






