দেশে তীব্র গরমের মধ্যে যখন মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, তখন ঘরের নীরব সঙ্গী পোষা প্রাণীরাও একই রকম ভুগছে। তারা অস্বস্তি বা অসুস্থতা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ফলে সমস্যা গভীর হলে তা বোঝা যায় দেরিতে, যা ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

কুকুর, বিড়াল, খরগোশ বা পাখির মতো পোষা প্রাণীরা অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না। হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা বা হঠাৎ অসুস্থতার ঝুঁকি এ সময় বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই গরমে তাদের যত্ন নেওয়া শুধু দায়িত্ব নয়, সতর্কতার অংশ।

পোষা প্রাণীরা মানুষের মতো ঘামতে পারে না। কুকুররা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে হাঁপানোর মাধ্যমে। কিন্তু তীব্র গরমে এটি যথেষ্ট না হলে শরীরের তাপ দ্রুত বেড়ে যায় এবং হিটস্ট্রোক হতে পারে, যা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

গরমে পোষা প্রাণীর আচরণে পরিবর্তন দেখলে তা গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ করুন। যেমন দ্রুত শ্বাস, হাঁপানো, অতিরিক্ত লালা ঝরা, অস্থিরতা বা দুর্বলতা, বমি বা ডায়রিয়া, চোখ ও জিহ্বা লাল হয়ে যাওয়া। গুরুতর অবস্থায় তারা অজ্ঞানও হতে পারে। এমন লক্ষণ দেখলে তাড়াতাড়ি ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে যান।

গরমে পোষা প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত পরিষ্কার ও ঠান্ডা পানি রাখা জরুরি। এটি নিয়মিত বদলাতে হবে এবং বাইরে নিয়ে গেলে সঙ্গে পানি রাখুন। পানিশূন্যতা দ্রুত মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

অনেকে পানিশূন্যতা দূর করতে পোষা প্রাণীকে স্যালাইন (ওআরএস) খাওয়ান। কিন্তু সঠিক অনুপাত না হলে এটি ক্ষতি করতে পারে। কম পানিতে বেশি স্যালাইন মেশালে কিডনিতে চাপ পড়ে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হতে পারে। বেশি পানিতে কম স্যালাইন মেশালে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়, কোষের ক্ষতি হয় এবং পানিশূন্যতা বাড়তে পারে। তাই প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে চলুন, আন্দাজে তৈরি করবেন না এবং প্রয়োজনে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পোষা প্রাণীকে সরাসরি রোদে রাখবেন না। ছায়াযুক্ত বাতাসযুক্ত জায়গায় রাখুন। ঘরে ফ্যান বা এসি চালান, মেঝেতে ভেজা কাপড় বা ঠান্ডা ম্যাট ব্যবহার করলে স্বস্তি পাবে।

দুপুরের তীব্র রোদে বাইরে নেবেন না। সকাল বা সন্ধ্যায় হাঁটানো নিরাপদ। গরম রাস্তায় পায়ের পাতা পুড়ে যেতে পারে।

গরমে খাবারের রুচি কমে যায়, তাই হালকা সহজপাচ্য খাবার দিন। খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই বারবার বদলান এবং তাজা খাবার নিশ্চিত করুন।

কুকুরকে কখনো বন্ধ গাড়িতে রেখে যাবেন না, এটি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়। বিড়ালের জন্য ঠান্ডা নিরিবিলি জায়গা দিন এবং নিয়মিত লোম ব্রাশ করুন।

গরমে লোম কেটে দিলে আরাম পাবে মনে করা ভুল। লোম প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর। বিশেষ করে ডাবল কোটযুক্ত কুকুরে এটি তাপ ও সূর্যের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। সম্পূর্ণ শেভ করলে ত্বকে সানবার্ন বা সমস্যা হতে পারে। তাই হালকা ছাঁটাই করুন।

খাঁচা সরাসরি রোদে রাখবেন না। পানি-খাবার দ্রুত গরম হয়, তাই নিয়মিত বদলান এবং বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন।

প্রাণী অচেতন হলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, শরীর অস্বাভাবিক গরম লাগলে বা খাওয়া বন্ধ করলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের কাছে নিন।

তীব্র গরমে পোষা প্রাণীর যত্ন মানে শুধু খাবার-আশ্রয় নয়, নিয়মিত শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ। পর্যাপ্ত পানি, সঠিক পরিবেশ, সুষম খাদ্য ও চিকিৎসা—এসব সামান্য সচেতনতা বড় ঝুঁকি এড়াতে পারে।

• ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। [email protected]