কক্সবাজারের পেকুয়ার করিয়ারদিয়া দ্বীপে সাড়ে তিন হাজার মানুষ চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। এখানে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানি বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব রয়েছে। একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্রটিও ঝুঁকিপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা বাড়ছে, ধানসহ ফসলের চাষ কমছে।

একদিকে সাগর, অন্যদিকে মাতামুহুরী নদী—মাঝখানে বিচ্ছিন্ন করিয়ারদিয়া দ্বীপ। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের এই দ্বীপে চারপাশে পানি ঘিরে রেখেছে। সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সেতু বা নিরাপদ যোগাযোগ নেই। সবচেয়ে বড় ভয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস।

দ্বীপ থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাতে দ্বীপ থেকে তার আলো দেখা যায়। কিন্তু এই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি স্থানীয়দের জীবনে। দ্বীপে যাওয়ার সেতু নেই। প্রধান সড়ক মাত্র আট ফুট চওড়া—কোথাও ইট বিছানো, কোথাও উঠে গেছে, আবার কোথাও কাঁচা। পুরো দ্বীপে মাত্র তিনটি ইজিবাইক, বেহাল সড়কে সব জায়গায় যেতে পারে না। জরুরি অবস্থায় নৌকা বা পায়ে হাঁটতেই হয়।

পুরো দ্বীপের মানুষের জন্য এখনো একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হামিদ হোছাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ১৯৯৪ সালে সৌদি অর্থায়নে করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি নির্মাণ হয়। লবণাক্ততার প্রভাবে ভবনটির বেশ কিছু অংশ খসে পড়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনের পর ২০২৩ সালে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। বর্তমানে ১১৫ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।

দ্বীপে কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। অসুস্থ হলে ডিঙিতে মূল ভূখণ্ডে যেতে হয়। রাতে বা খারাপ আবহাওয়ায় পারাপার প্রায় অসম্ভব। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য এটি বড় ঝুঁকি। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে মানুষ। প্রসূতিরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান। অনেকে বাচ্চা জন্মানোর সময় মূল ভূখণ্ডে আত্মীয়ের বাড়িতে যান।

২৩ জানুয়ারি রাতে প্রবাসী মোহাম্মদ সেলিমের স্ত্রী শাহীনা আকতারের (৩২) প্রসববেদনা শুরু হয়। নৌকা না পাওয়া ও ভাঙা সড়কের কারণে রাতে হাসপাতালে নেওয়া যায়নি। পরদিন সকালে পেকুয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলেও নবজাতক বাঁচেনি। মোহাম্মদ সেলিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘করিয়ারদিয়া দ্বীপে স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় খুব কষ্ট পেতে হয় আমাদের। এক দিন পর হাসপাতালে নেওয়ার কারণে আমার স্ত্রীর নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে নবজাতক মারা যায়। এভাবে আমরা আমাদের সন্তান বা স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলছি।’

বিশুদ্ধ পানিরও প্রকট সংকট। শুষ্ককালে নলকূপ শুকিয়ে যায়, যেখানে পানি পাওয়া যায় তাও লবণাক্ত। অনেকে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করেন বা দূর থেকে আনেন, এতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

গুদামপাড়ার সৈয়দা খাতুন (৪৫) বলেন, নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। দুর্যোগের সময় সংকট আরও তীব্র হয়।

বেহাল আশ্রয়কেন্দ্র

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনও তাড়া করে। সেই দুর্যোগে দ্বীপে দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। তিন দশক পরও নিরাপত্তা বদলায়নি।

একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হামিদ হোছাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ১৯৯৪ সালে সৌদি অর্থায়নে করিয়ারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি নির্মাণ হয়। লবণাক্ততার প্রভাবে ভবনটির বেশ কিছু অংশ খসে পড়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পরিদর্শনের পর ২০২৩ সালে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। বর্তমানে ১১৫ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছেন।

ভবনে দেয়াল, বিমে বড় ফাটল, ছাদে পলেস্তারা খসছে। সিঁড়ি ভেঙে গেছে। শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে পড়াশোনা করছে। বড় ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ে ভবন ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা।

বর্ষা বা নিম্নচাপে আতঙ্ক বাড়ে। পুরো দ্বীপের মানুষ এই এক ভবনে আশ্রয় নেয়। পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। গবাদিপশু নিচতলায় বেঁধে রাখতে হয়, র‍্যাম্পের অভাবে জলোচ্ছ্বাসে রক্ষা কঠিন।

ষাটোর্ধ্ব কালু মিয়া ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় স্মরণ করে বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় দুই শতাধিক মানুষ মারা গেছে। বেশিরভাগ নৌকায় আশ্রয় নেয়, ঝোড়ো হাওয়ায় ডুবে প্রাণ হারায়। পরে আশ্রয়কেন্দ্র হলেও এখন ঝুঁকিপূর্ণ।

পেকুয়া উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আশীষ বোস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত ভবনে আর শ্রেণি কার্যক্রম চালবে না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমরা নিচে একটি শেড তৈরি করে সেখানে ক্লাস করাব। ইতিমধ্যে এই কাজের জন্য সাত লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বহুতল ভবন নির্মাণে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে কাজ চলছে।’

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এমদাদুল হক শরীফ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দ্বীপের একটিমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র কাম বিদ্যালয় এত ঝুঁকিপূর্ণ, সেটি জানতাম না। দ্রুত সময়ের মধ্যে কীভাবে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায়, সেটি দেখছি।’

বাড়ছে জোয়ার ও লবণাক্ততা

বর্ষায় বেড়িবাঁধ ভাঙছে, অল্প বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। জোয়ারের উচ্চতা বেড়েছে, লবণাক্ততা ছড়িয়েছে। কৃষি উৎপাদন কমেছে।

আগে ধানচাষে নির্ভরশীল ছিল সবাই। এখন লবণ চাষ ও মাছের ঘের বেড়েছে। মাটির লবণাক্ততায় ধান-ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। কৃষকরা পেশা বদলাচ্ছেন, পরিবেশ ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

ষাইটপাড়ার কৃষক আবু তাহের (৫৫) বলেন, আগে এই জমিতে ভালো ধান হতো। এখন লবণপানি ঢুকে ফসল নষ্ট হয়। অনেকে ধানের জমিকে শুষ্ককালে লবণের মাঠ ও বর্ষায় মাছের ঘের করছেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্যসেবা দুর্বল। মোবাইল নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়। সতর্কবার্তা দেরিতে পৌঁছায়। ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র বা প্রশিক্ষণ নেই। সরকারি কর্মকর্তাদের তৎপরতা কম।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাবেক সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে। ফলে মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। করিয়ারদিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলো এই সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদও দেন তিনি।