ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির উত্থানের পাশাপাশি মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এই প্রবণতা সারা দেশ জুড়ে লক্ষণীয়। ২০১৩ সালে দেশের সকল রাজ্যে মোট মুসলিম বিধায়ক ছিলেন ৩৩৯ জন, যা এখন নেমে এসেছে ২৫৫-এ।

কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দল এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, জেডিউ ও বামপন্থী দলগুলো মুসলিমদের প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।

উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসন জিতেছে, যার মধ্যে ৩৫ জন মুসলিম। তৃণমূল ছাড়া বিরোধী দলগুলো আরও ছয়টি আসন দখল করেছে—কংগ্রেস ২, সিপিএম ১, আইএসএফ ১ এবং তৃণমূল থেকে বিতাড়িত হুমায়ুন কবিরের নতুন দল এজেইউপি ২টি। সব জয়ী প্রার্থীই মুসলিম। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে একজন মুসলিম প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি, তাই জয়ের প্রশ্নই ওঠেনি।

আসাম বিধানসভা নির্বাচনেও কংগ্রেসের জয়ী আসনগুলোর অধিকাংশ মুসলিম বহুল এলাকায়। আগে এই রাজ্যের ৩৫টি আসন মুসলিম ভোটের উপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় সীমানা পুনর্বিন্যাসের (ডিলিমিটেশন) পর সংখ্যা নেমে এসেছে ২২-এ। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম হলেও প্রতিনিধিত্বের হার মাত্র ১৭ শতাংশের কাছাকাছি।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী গর্বিতভাবে বলেছেন, "নন্দীগ্রামের মুসলিমদের একটি ভোটও তিনি পাননি। হিন্দুদের ভোটেই তিনি জিতেছেন।"

ভবানীপুরে গণনা চলাকালীন শুভেন্দু জোর দিয়ে বলেছিলেন, মুসলিম বহুল ওয়ার্ডে তিনি পিছিয়ে থাকবেন, কিন্তু হিন্দুপ্রধান এলাকায় জিতবেন। তখন তিনি ১৯ হাজারের বেশি ভোটে পিছিয়ে ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারান।

এবারের নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার জনবিন্যাসে দেখা যায়, সকল মুসলিম বিধায়ক বিরোধী পক্ষে। ফলে সরকার সমালোচিত হলে বিজেপি নেতারা বলতে পারবেন, মুসলিমরাই সরকারের বিরোধিতা করছে। বিধানসভায় এই আখ্যান প্রাধান্য পেলে তা অভূতপূর্ব হবে, কারণ স্বাধীনতার পর এই প্রথম বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে।

মুসলিম বিধায়কদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কমেছে উত্তর প্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, পশ্চিমবঙ্গের মতো বড় রাজ্যে। ২০১৩ সালে উত্তর প্রদেশে ছিল ৬৩ জন, এখন ৩১ জন। ১২ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গে ৫৯ জন ছিলেন, এখন ৪৬ জন। বিহারে ১৯ থেকে ১১, রাজস্থানে ১১ থেকে ৬ জনে নেমেছে।

প্রতিটি রাজ্যেই জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব অনেক কম। উত্তর প্রদেশে জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিম, কিন্তু প্রতিনিধিত্ব মাত্র ৮ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে ২৮ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা, প্রতিনিধিত্ব সাড়ে ১২ শতাংশ। বিহারে ১৭ শতাংশ মুসলিম হলেও বিধানসভায় সাড়ে ৪ শতাংশ।

মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে মুসলিম জনসংখ্যা ১০ শতাংশ হলেও এমএলএর সংখ্যা ৪ শতাংশের নিচে। কেরালায় তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এবার ৩৬ থেকে নেমে ৩৪ জন। কর্ণাটকে ১১ থেকে ৯। গুজরাটে মাত্র ১ জন মুসলিম এমএলএ।

দেশে সাতটি রাজ্যে একজনও মুসলিম জনপ্রতিনিধি নেই—ছত্তিশগড়, গোয়া, অরুণাচল প্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, মিজোরাম, সিকিম ও নাগাল্যান্ড।

জম্মু–কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্র পুনর্বিন্যাস হয়েছে। আসামের মতো সেখানেও সীমানা পুনর্বিন্যাসের ফলে মুসলিম এমএলএ ৫৮ থেকে কমে ৫১ জনে এসেছে।

ব্যতিক্রম মাত্র তিনটি রাজ্য—তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ ও মেঘালয়, যেখানে মুসলিম জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ১ করে বেড়েছে। ত্রিপুরায় বিজেপির টিকিটে ২০২৩ সালে বক্সানগর উপনির্বাচনে তোফাজ্জল হোসেন জয়ী হয়ে ত্রিপুরার ইতিহাসে বিজেপির প্রথম মুসলিম বিধায়ক হয়েছেন।