২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করে, তার চূড়ান্ত ফলাফল সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা। এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভয়ংকর পরিণতি ঘটতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল, গ্যাস ও পানি শোধনাগারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইরান এমন ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম যা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহ্য করা কঠিন এবং বিশ্বের জন্যও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
যুদ্ধের মূল পরিকল্পনা ছিল ‘শিরশ্ছেদ আঘাত’ ধরনের। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদের প্রধান ডেভিড বারনিয়া এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পেশ করেন। তাঁদের ধারণা ছিল, যৌথ বিমান হামলায় ইরানের শাসনকাঠামো, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নেতৃত্ব ভেঙে ফেলা যাবে। এরপর সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকার গঠন সম্ভব হবে।
ট্রাম্প মনে করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও একই ঘটনা ঘটবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু গোষ্ঠী জড়িত ছিল। সেখানে সরকার বদলালেও প্রশাসনের অনেক অংশ আগের মতোই রয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্প ভেবেছিলেন, ইরানেও একইভাবে ফলাফল পাওয়া যাবে।
কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। ইরান ভেনেজুয়েলার মতো নয়। ইতিহাস, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক শক্তি, জনসংখ্যা বা আন্তর্জাতিক অবস্থান—কোনো ক্ষেত্রেই তুলনীয় নয়। তাই কারাকাসে যা ঘটেছে, তেহরানে তা ঘটার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।
বাস্তবে ইরানের সরকার ভেঙে পড়েনি; বরং বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা বেড়েছে। সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর অটুট রয়েছে, ধর্মীয় নেতৃত্ব একজোট হয়েছে এবং সাধারণ জনগণও বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
সম্ভবত ট্রাম্প এই পিছু হটাকে বিজয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এই যুদ্ধ দেখিয়েছে—ইরানকে যতটা সহজ মনে করা হয়েছিল, তারা তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই যুদ্ধ দেখিয়েছে, এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। এই যুদ্ধ আরও দেখিয়েছে—আধুনিক যুদ্ধের প্রযুক্তি আমেরিকার জন্য আগের মতো আর সুবিধাজনক নেই।
দুই মাস পর দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর হাতে কোনো বিকল্প সরকার নেই। ইরানের আত্মসমর্পণের কোনো লক্ষণ নেই, এমনকি জয়ের কোনো সামরিক পথও খোলা নেই। ফলে একমাত্র সম্ভাব্য পথ পিছু হটা। এতে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে এবং দুই দেশের মধ্যে মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যাবে।
এই পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি মৌলিক ভুল কাজ করেছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছে। ইরান এক প্রাচীন সভ্যতা, যার ইতিহাস প্রায় পাঁচ হাজার বছরের। তাদের সংস্কৃতি, জাতীয় চেতনা ও আত্মমর্যাদা অত্যন্ত গভীর। অতীতে ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করে দমনমূলক শাসন বসিয়েছিল—এই স্মৃতি তাদের মনে জ্বলজ্বল করে। তাই শুধু হুমকি বা বোমা হামলায় তারা নতি স্বীকার করবে না।
দ্বিতীয়ত, ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে হেস্তেস্তে দেখা হয়েছে। ইরানে উচ্চমানের প্রকৌশলী ও গণিতবিদ রয়েছে। তারা নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে। উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি এবং নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণ ক্ষমতা তৈরি করেছে। দীর্ঘ ৪০ বছরের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই অগ্রগতি সত্যিই উল্লেখযোগ্য।
তৃতীয়ত, যুদ্ধের প্রযুক্তিগত দিক এখন ইরানের পক্ষে যাচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় অনেক কম। একটি ড্রোন তৈরিতে ইরানের প্রায় ২০ হাজার ডলার লাগে, কিন্তু তা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রে ৪০ লাখ ডলার খরচ হয়। আবার তুলনামূলক সস্তা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েই ইরান কয়েকশ কোটি ডলার মূল্যের যুদ্ধজাহাজকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ চালানোর খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়ই ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে খুব সীমিত একটি গোষ্ঠীর মধ্যে, যেখানে নিয়মিত পরামর্শ বা বিশ্লেষণের অভাব ছিল। জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের প্রধান জো কেন্ট প্রকাশ্যে পদত্যাগ করে জানান, সেখানে একটি ‘প্রতিধ্বনি চক্র’ তৈরি হয়েছিল যা প্রেসিডেন্টকে ভুল পথে নিয়ে গেছে।
এই যুদ্ধ ছিল না প্রয়োজনীয়, না পরিকল্পিত। এটি হঠকারী সিদ্ধান্তের ফল। এর পেছনে ছিল আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক প্রভাব ধরে রাখতে চেয়েছিল। ইসরায়েল আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লোভ করেছিল, যা বাস্তবে অসম্ভব।
সব মিলিয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হলো—যুদ্ধ শেষ হবে প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে এসে, তবে কিছু পরিবর্তন নিয়ে। ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ রাখবে, তাদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়বে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমবে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বা ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি—এই বিষয়গুলো প্রায় আগের জায়গায় থেকে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটলেও ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসী হবে না। কারণ তারা দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা চায়। নতুন যুদ্ধ শুরু করতে চায় না এবং রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্ররাও স্থিতিশীলতা কামনা করে।
সম্ভবত ট্রাম্প এই পিছু হটাকে বিজয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এই যুদ্ধ দেখিয়েছে—ইরানকে যতটা সহজ মনে করা হয়েছিল, তারা তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এই যুদ্ধ দেখিয়েছে, এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। এই যুদ্ধ আরও দেখিয়েছে—আধুনিক যুদ্ধের প্রযুক্তি আমেরিকার জন্য আগের মতো আর সুবিধাজনক নেই।
যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ জিততে পারবে না—অন্তত এমন খরচে নয় যা তারা বহন করতে সক্ষম। তবে তারা চাইলে এখনো বাস্তবতায় ফিরে আসতে পারে। ইরানের শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির পথে যেতে পারে।
জেফ্রি স্যাক্স কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
সিবিল ফারেস জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্কে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক উপদেষ্টা
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।






