প্রতিবেশী অটোরিকশাচালকের অটোতে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে চড়ত কিশোরটি। পরে চালকটি জানতে পারেন, কিশোরটি ইয়াবা বিক্রিতে জড়িত। এরপর তিনি বিক্রির লাভের অংশ দাবি করেন। কিন্তু কিশোরটি রাজি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজনের সাহায্যে কোদাল দিয়ে তাকে হত্যা করেন। লাশ গোপন করতে পাহাড়ে মাটি চাপা দেওয়া হয়। তিন সপ্তাহ পর শিয়ালের দল টেনে বের করে লাশ। তখন স্থানীয়রা কিশোরটির মৃত্যুর খবর পান।

চার বছর আগের এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় সম্প্রতি পুলিশ অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করে। আদালতে তার জবানবন্দিতে হত্যার পুরো বিবরণ উঠে আসে।

ধারালো কোদাল দিয়ে কিশোরটির পা ও গলায় আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় কিশোরটির। হত্যার পর প্রমাণ গোপন করতে পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে বিচ্ছিন্ন মাথা ও দেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। বিচ্ছিন্ন মাথা থেকে চুলও কেটে ফেলা হয়, যাতে সহজে লাশ কেউ চিনতে না পারে।

২০২২ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় উঁচুর বিল পুরানগড় এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। কিশোরকে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন অটোরিকশাচালক মো. পারভেজ (২৪)। গত শুক্রবার চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

আদালত সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে মো. পারভেজ বলেন, নিহত কিশোরের সঙ্গে বয়সের ব্যবধান থাকলেও প্রতিবেশী হিসেবে দুজন বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। কিশোরটির বাবা কৃষক। সাতকানিয়ার উঁচুর বিল পুরানগড় এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় তার পরিবার থাকত। অর্থের লোভে অল্প বয়সেই মাদক পাচারে জড়ায় সে।

জবানবন্দিতে পারভেজ বলেন, তার অটোরিকশায় ইয়াবা আনা-নেওয়া হতো। কিশোরটি প্রায়ই অটো নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যেত এবং দ্বিগুণ ভাড়া দিত। একসময় তিনি বুঝতে পারেন কিশোরটি ইয়াবা বিক্রিতে জড়িত। তাই লাভের অংশ দাবি করেন। কিন্তু কিশোরটি দিতে চায়নি। এতে ক্ষিপ্ত হন পারভেজ।

জবানবন্দি অনুসারে, ২০২২ সালের ১৭ জুলাই রাতে কিশোরটি গ্রামে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যারম খেলছিল। পারভেজ সাকিব নামের এক তরুণকে পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনান। সাকিব কিশোরটিকে স্থানীয় এক কলেজের মাঠে নিয়ে যান। সেখানে পারভেজ, সাকিবসহ কয়েকজন তাকে ঘিরে ইয়াবা ও টাকা দাবি করেন। তার পকেট থেকে টাকার বান্ডিল ছিনিয়ে নেন। পরে মারধর করে পাশের সেতুতে নিয়ে যান। সেখানে হাত-পা চেপে ধরে রাখেন। কিশোরটি বলতে থাকে, ‘আমার সব নিয়ে যাও, তবু প্রাণে বাঁচতে দাও।’ তখন হামলাকারীদের মধ্যে হাসান নামের একজন বলেন, ‘তাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। বেঁচে থাকলে সবাইকে আমাদের নাম বলে দেবে।’ এরপর ধারালো কোদাল দিয়ে পা ও গলায় আঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে মাথা-দেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। মাথা থেকে চুল কেটে ফেলা হয় যাতে চেনা না যায়।

ঘটনাস্থলের রক্ত মুছে পানি ঢালেন হত্যাকারীরা। প্রায় ২০-২১ দিন পর শিয়ালের দল পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে লাশের অংশ বের করে। পরিবারের লোকেরা পোশাক দেখে শনাক্ত করেন।

লাশ উদ্ধারের পর কিশোরটির বাবা সাতকানিয়া থানায় মামলা করেন। প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করে। কিন্তু অগ্রগতি না হওয়ায় বাদী সিআইডিতে হস্তান্তরের আবেদন করেন। ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর আদালত সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলা তদন্ত করছেন সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মোশারফ হোছাইন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নিহত কিশোরের চলাচলের তথ্য খুঁজতে সাতকানিয়ায় বারবার যাওয়ার পর পারভেজের সন্ধান পাওয়া যায়। কিশোরটি তার অটোতে চলাফেরা করত। গত বৃহস্পতিবার রাতে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সম্পৃক্ততা স্বীকার করেন। তারপর গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয়। তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অন্য জড়িতদের গ্রেপ্তারে সিআইডির অভিযান চলছে।

সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. সালাহ উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ক্লুলেস এই মামলার পুরো রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। মূলত ইয়াবা বিক্রির লাভের অংশ না পেয়ে অটোরিকশাচালক পারভেজের পরিকল্পনায় কিশোরটিকে খুন করে লাশ গুম করা হয়েছিল। এই মামলায় শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

মামলার বাদী ও নিহত কিশোরের বাবা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নৃশংসভাবে আমার ছেলেকে মেরে লাশ গুম করে রেখেছিল আসামিরা। পারভেজের গাড়িতে করে এদিক-ওদিক যেত আমার ছেলে। আমি কল্পনাও করতে পারিনি, সেই পারভেজই আমার ছেলেকে টাকার লোভে মেরে ফেলবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হোক। আমি সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আর কেউ যাতে ভবিষ্যতে কারও মা-বাবার বুক খালি করতে না পারে।’