বিএনপি ও তিন সহযোগী সংগঠনের এক হাজারের বেশি মাঠপর্যায়ের নেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মতবিনিময় সভা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান জানিয়েছেন তিনি।

ক্ষমতায় আসার আড়াই মাস পর শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটি ছিল বিএনপির বড় আকারের প্রথম সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, সব বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকসহ জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন। তিন সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পাঁচজন করে শীর্ষ নেতাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়।

বেলা পৌনে ১১টায় শুরু হয়ে রাত প্রায় ৮টা পর্যন্ত চলে সভা। মাঝে দুপুরের খাবার ও নামাজের বিরতি ছিল। রুদ্ধদ্বার এই সভায় ১১ জন মন্ত্রী বক্তব্য দেন এবং নেতাদের প্রশ্নের জবাব দেন।

সভায় প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কাউকে ‘জিতিয়ে আনা’ হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। মাঠপর্যায়ের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে এবং ভালো আচরণ করে মানুষের মন জয় করতে আহ্বান জানান।

স্থানীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গে তিনি প্রয়াত বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশাল জানাজার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশের মানুষ তাঁদের প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তার প্রতিদান তাঁকে ও বিএনপিকে দিতে হবে। এর জন্য নেতা-কর্মীরা জনগণের পাশে থাকতে হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো প্রশাসনিক প্রভাব বা দলীয় সুবিধা দিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দলের নেতা–কর্মীদের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, দলের সমর্থন ও সমন্বয় ছাড়া সরকার সফল হতে পারবে না। তাই নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে করা সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য নতুন সংগ্রামে নামতে হবে।

বৈঠক সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকারের মনোভাব ছিল সভার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাসহ মাঠপর্যায়ের নেতারা আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি তোলেন। একজন নেতা জিয়াউর রহমানের সময়কার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে সময় মানুষ দরজা খুলে ঘুমাত। সে ধরনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ আস্থার সঙ্গে বসবাস করতে পারে এবং সেটা এই পুলিশকে দিয়েই সম্ভব।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সবাইকে সতর্ক করে বলেন, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। এর জন্য যা যা করার করা হবে। এ ক্ষেত্রে কারও পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। যার যার ভুলত্রুটি আছে, তাদের শুধরে নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলায় শিথিলতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন ও দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও এখন থেকে কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা হবে। সামনে আর সহজ করে দেখা হবে না, কঠিনভাবেই দেখা হবে। তাই নিজেদের মধ্যে বিভেদ কমিয়ে আনতে হবে।

মাঠপর্যায়ের নেতারা মন্ত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এইচএসসি পরীক্ষা কেন এগিয়ে আনা হলো। এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে জানা হয়, নির্বাচনের আগে প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি কোন পর্যায়ে আছে। এ পর্যন্ত ১৬৫ জন খেলোয়াড়কে ক্রীড়া কার্ড দেওয়া হয়েছে, এটা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে কি না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের কাছে প্রশ্ন ছিল, কিছু হলেই রোগীদের ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য চরম। জেলা হাসপাতালগুলোতে সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। নেতারা রেল, রাস্তাঘাট, সেতুসহ স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরেন। মন্ত্রীরা সমস্যা সমাধানে আশ্বস্ত করেন।

বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলে পুনর্গঠন করাই এখন বিএনপি সরকারের নতুন চ্যালেঞ্জ। এখন যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো তৃণমূল পর্যায়ে সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নেতা–কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সভায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু প্রমুখ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই মতবিনিময় সভার মূল বার্তা হচ্ছে, দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচনে মানুষের ভালোবাসা অর্জনে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে এবং নেতা-কর্মীদের বিভেদ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। প্রতি তিন–চার মাস অন্তর মন্ত্রী ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের নিয়ে এ ধরনের সভা করা হবে। যাতে মন্ত্রীদের জবাবদিহির পাশাপাশি সরকারের জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়।