আর্জেন্টিনা থেকে এক মাস আগে যাত্রা শুরু করা এমভি হোন্ডিয়াস নামক প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ এ ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ পর্যন্ত জাহাজের তিন যাত্রী এই ভাইরাসে মারা গেছেন। আরও কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

যাত্রীদের মধ্যে আর কেউ কি ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ যাত্রীরা ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ফ্লাইটে ফিরে গেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গতকাল শুক্রবার জানায়, প্রমোদতরিতে হান্টাভাইরাস ছড়ানোর পর মোট আটজন আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ছয়জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে (মৃত্যুহার ৩৮ শতাংশ)। ৮ মে পর্যন্ত এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ফরাসি ভাষায় দেওয়া এক বিবৃতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, নিশ্চিত আক্রান্তদের সবাই ‘আন্দেস’ ধরনের হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত। এই ধরন মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম।

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য এ ভাইরাসের ঝুঁকি খুবই কম। তাই প্রশ্ন উঠছে, এ নিয়ে কতটা চিন্তা করা উচিত?

বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ত্ববিদ মারিয়া ভ্যান কারকোভ আশ্বস্ত করে বলেন, “এটি কোনো মহামারির সূচনাপর্ব নয়।”

মারিয়া আরও বলেন, ‘এটি কোভিড নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়, এটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ছড়ায়।’

হামের মতো রোগের তুলনায় ‘আন্দেস’ ধরনের হান্টাভাইরাস ততটা সংক্রামক নয়। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর আশঙ্কা থাকলেও বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের ঝুঁকি খুবই কম বলেছে ডব্লিউএইচও।

জাহাজে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কীভাবে শুরু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর প্রস্রাব, মল বা লালার কণা মিশ্রিত বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়।

প্রমোদতরি দূরবর্তী বন্য প্রাণীর এলাকায় গিয়েছিল। তখন সম্ভবত কোনো যাত্রী সংস্পর্শে এসে জাহাজে উঠেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের ঘটনায় খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এই ধরনের ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। তাই ধারণা, এমভি হোন্ডিয়াসে কিছু সংক্রমণ এভাবেই হয়েছে।

বিলাসবহুল প্রমোদতরিতে জায়গা সীমিত থাকে। যাত্রীরা একই কেবিন ও ডাইনিং এলাকা ভাগ করে ব্যবহার করেন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘ সময় কাছাকাছি শারীরিক সংস্পর্শে থাকলে ভাইরাস ছড়াতে পারে।

এমভি হোন্ডিয়াসে মৃত তিনজনের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের এক নারীও রয়েছেন। গত ২৪ এপ্রিল সেন্ট হেলেনা দ্বীপে পৌঁছে তিনি জাহাজ থেকে নামেন। তিনি আগে স্বামীর সঙ্গে এক কেবিনে ছিলেন, যিনি ১১ এপ্রিল জাহাজেই মারা যান। তবে স্বামী হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কিনা, তা নিশ্চিত নয়।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএইচএসএ) বলেছে, হান্টাভাইরাস সাধারণ সামাজিক মেলামেশা—যেমন বাইরে হাঁটা, দোকানে যাওয়া, কর্মস্থল বা স্কুলে যাওয়া—দিয়ে ছড়ায় না।

ভাইরাসের লক্ষণ সংক্রমণের দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয়, কখনো এক মাসের বেশি পরেও। জাহাজ, হাসপাতাল বা ফ্লাইটে সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণ করা হবে।

ইউকেএইচএসএ বলেছে, এমভি হোন্ডিয়াস থেকে যুক্তরাজ্যে ফিরা সব যাত্রীকে সতর্কতামূলকভাবে ৪৫ দিন স্বেচ্ছায় আইসোলেশনে থাকতে বলা হবে।

ইউকেএইচএসএ-র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক রবিন মেই বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি ‘খুবই নগণ্য’ বা প্রায় নেই।

আন্দেস ধরনের হান্টাভাইরাসে উপসর্গ ফ্লুর মতো—জ্বর, ক্লান্তি, শরীর ব্যথা। শ্বাসকষ্ট, পেটব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি বা ডায়রিয়াও হতে পারে। পরীক্ষায় শনাক্ত করা যায়, তবে নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। দ্রুত হাসপাতালে সহায়তা পেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। চিকিৎসা উপসর্গভিত্তিক।

ইউকেএইচএসএ-র সংক্রমণ বিভাগের উপপরিচালক মীরা চাঁদ বলেন, ‘সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি এখনো খুবই কম। এ বিষয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করা জরুরি।’

এমভি হোন্ডিয়াসকে তিন দিন কেপভার্দের কাছে নোঙর করে রাখা হয়। এখন এটি স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের পথে। বাকি যাত্রী ও ক্রু নিজ নিজ দেশে ফ্লাইটে ফিরবেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জাহাজ পরিদর্শন করেছে। যাত্রীদের জাহাজেই আইসোলেট করা হয়েছে এবং পুরো জাহাজ পরিষ্কার করা হয়েছে।

ভ্রমণ সংস্থা ওশেনওয়াইড এক্সপিডিশনস গত বৃহস্পতিবার বলেছে, জাহাজে এখন কোনো যাত্রীর উপসর্গ নেই। গত ২৪ এপ্রিল সেন্ট হেলেনায় যুক্তরাজ্যের সাতজনসহ ৩০ যাত্রী নামেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।

ইউকেএইচএসএ জানায়, সেন্ট হেলেনা থেকে নামা যুক্তরাজ্যের দুই নাগরিক জোহানেসবার্গ থেকে ফ্লাইটে ফিরে সংক্রমণের খবর জানতে পারেন। তারা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এখন স্বেচ্ছায় আইসোলেশনে আছেন, উপসর্গ নেই। অন্য পাঁচজন এখনো দেশে ফেরেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ও অ্যারিজোনার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বিবিসিকে বলেছেন, জাহাজ থেকে ফিরা তিন যাত্রীকে তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁদের কারও উপসর্গ দেখা যায়নি।