প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি আবার অপরিশোধিত তেল শোধন শুরু করেছে। সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর এই কার্যক্রম গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে ধাপে ধাপে চালু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হচ্ছে।
রিফাইনারি সূত্র জানায়, গত মার্চের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী অপরিশোধিত তেল দেশে আসেনি। সৌদি আরবের রাসতানুরা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল ধানা বন্দর থেকে যেসব চালান আসার কথা ছিল, সেগুলো আটকে যায়। এতে শোধনাগারের মজুত দ্রুত কমতে থাকে এবং ১২ এপ্রিলের পর থেকে মূল পরিশোধন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
দেশের জ্বালানি চাহিদা মাত্র ২০ শতাংশ আসে এই শোধনাগার থেকে। এ কারণে উৎপাদন কমে গেলেও প্রভাব খুব বেশি পড়েনি বলে দাবি করেন কর্মকর্তারা।
বন্ধের সময় সীমিত পরিসরে কিছু উৎপাদন চালু থাকলেও তা ছিল নামমাত্র। দিনে ৫০ থেকে ১০০ টন করে পেট্রল ও বিটুমিন উৎপাদন করা হচ্ছিল। এতে বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
নতুন জাহাজ আসায় পরিস্থিতি কাটছে। সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজ কুতুবদিয়ায় নোঙর করেছে। সেখান থেকে ছোট জাহাজে তেল আনা হচ্ছে পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। দিনে ১০ হাজার টন করে তেল আনা যায়, ফলে ১ লাখ টন তেল পতেঙ্গায় পৌঁছাতে আরও ৯ থেকে ১০ দিন লাগবে। তেল আসা শুরু হওয়ায় গতকাল থেকে ‘ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট’ চালু হয়েছে, যা শোধনপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ইউনিট পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফেরানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গতকাল সকাল থেকেই শোধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রিফাইনারিতে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করা যায়। এই পরিমাণ তেল প্রক্রিয়াজাত করলে প্রতিদিন ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টন ডিজেল উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া ২০০ টন পেট্রল, প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন ফার্নেস অয়েল, ২০০ টনের মতো বিটুমিন এবং ৪০০ থেকে ৬০০ টন ন্যাফথা উৎপাদিত হয়। অপরিশোধিত তেলের ধরন ও চাহিদার ভিত্তিতে এই অনুপাত কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
এই শোধনাগার মূলত সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান ক্রুড অয়েল’ পরিশোধন করে। এখান থেকে ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস অয়েল, বিটুমিনসহ ১৩ ধরনের পণ্য উৎপাদন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রিফাইনারিতে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করা যায়। এই পরিমাণ তেল প্রক্রিয়াজাত করা হলে প্রতিদিন ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টন ডিজেল উৎপাদন সম্ভব।
রিফাইনারি সূত্র জানায়, যুদ্ধ শুরুর আগে শোধনাগারে প্রায় দেড় লাখ টন অপরিশোধিত তেলের মজুত ছিল। নতুন চালান না আসায় এই মজুত কমে গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হয়ে যায়। তবে দেশের জ্বালানি চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ এখান থেকে আসে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেন, উৎপাদন কমলেও প্রভাব খুব বেশি পড়েনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে জ্বালানি সরবরাহ এখন অনেকটাই সরাসরি আমদানি করা পরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল। গত অর্থবছরে আমদানি করা মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৭৬ শতাংশই ছিল পরিশোধিত তেল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে ব্যয় ও ঝুঁকি—দুটিই দ্রুত বাড়ে। মূলত দেশের জ্বালানি তেলের খাত পুরোটাই নির্ভর করে আমদানি করা পরিশোধিত তেলের ওপর।
অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মাত্র দুটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন তলানিতে নেমে যাচ্ছে। আর এর চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ছে।
উৎস বাড়ানোর পরামর্শ
জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্ভরতা খুব সীমিত কয়েকটি উৎসের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বা হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হলেই সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়ে। এ কারণে বিকল্প উৎস, বড় মজুত–সুবিধা এবং দ্বিতীয় শোধনাগার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। বর্তমানে মাত্র ২ লাখ ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত করতে পারে কোম্পানিটি।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ইস্টার্ন রিফাইনারি কর্তৃপক্ষ বিকল্প উৎস সন্ধান শুরু করে। প্রাথমিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়ার তেলকে ‘পরিশোধনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এসব দেশের ‘বনি ক্রুড’, ‘মালয়েশিয়ান ব্লেন্ড’, ‘আলবেইন ব্লেন্ড’ ও ‘আলজেরি ক্রুড’-এর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে—এগুলো বিদ্যমান শোধনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) পাঠানো হয়। এরপর মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন তেল কেনার প্রক্রিয়া শুরু করলেও তেল আনা এখনো সম্ভব হয়নি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মাত্র দুটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন তলানিতে নেমে যাচ্ছে। আর এর চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ছে। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী সরবরাহ চুক্তিতে যেতে হবে। একই সঙ্গে কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এমন সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।”






