জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অনেকের হৃদয়ে আশার দীপ জ্বালিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের অভ্যন্তরে সংকট দেখা দেয়। কয়েকজন নেতা দল ত্যাগ করেন। নির্বাচনের পরও জামায়াতের সঙ্গে জোট কতদিন টিকবে, সেই প্রশ্ন এনসিপির সভায় উঠেছিল।
তবে এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গেই থেকে এগোতে চায় এনসিপি। দলের নেতাদের যুক্তি, এক বছরে আলাদাভাবে চলার মতো সক্ষমতা অর্জিত হয়নি। এতে প্রশ্ন জাগছে, এভাবে কি এনসিপি রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান গড়তে পারবে?
এনসিপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলতে চান তারা। কিন্তু বর্তমান সাংগঠনিক শক্তিতে একাই তা চালানো সম্ভব নয়। তাই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যে থেকে আন্দোলন জোরদার করে ক্ষমতাসীন বিএনপির ওপর চাপ বাড়াতে চাইছেন তারা।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলে বিএনপিকে চাপে ফেলতে চাইছে এনসিপি। আর তা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যে থেকেই করতে চায়।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য দলীয় কর্মসূচি ও ১১–দলীয় ঐক্যে থেকে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলাই এখন এনসিপির অগ্রাধিকার। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরুত্থান যাতে না হতে পারে, সে জন্য জুলাই সনদের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হতেই হবে।”
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়। বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন থেকে সরে যাচ্ছে বলে ১১–দলীয় ঐক্যের অভিযোগ। সেই কারণে বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায় তারা।
এছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও জোটবদ্ধভাবে অংশ নিতে চায় এনসিপি। দলের নীতিনির্ধারকদের মতে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্তরে উল্লেখযোগ্য প্রার্থী জিতিয়ে দলের ভিত্তি মজবুত করতে পারবে।
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য দলীয় কর্মসূচি ও ১১–দলীয় ঐক্যে থেকে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলাই এখন এনসিপির অগ্রাধিকার।—আরিফুল ইসলাম আদীব, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি
দুজন সংসদ সদস্যসহ শীর্ষ পর্যায়ের তিন নেতার সঙ্গে কথা বলে এই চিন্তা জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, এনসিপির রাজনীতির মূল প্রতিশ্রুতি ফ্যাসিবাদ বিলোপের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার। সংগঠনিক বিস্তার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কাজ সম্ভব নয়। কিন্তু এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি এখনো প্রত্যাশিত স্তরে নেই। তাই বাধ্য হয়ে জোটের রাজনীতি করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনে দলের এক অংশ আপত্তি তুললেও বড় অংশ সমর্থন করেছিল। ফলে অন্তত ১৭ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেন, কয়েকজন নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকরা জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ঐক্য থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় অটল ছিলেন। ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে ৩০ জন অংশ নেন, যার মধ্যে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ ছয়জন জয়লাভ করেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে দলের বর্তমান কমিটির এক অংশেরও আপত্তি রয়েছে, তবে তাদের প্রভাব কম। দলের বাইরেও অনেকে এই জোটের সমালোচনা করেন। জামায়াতের সঙ্গে থেকে এনসিপি কি আলাদা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে, সে প্রশ্ন তোলেন তারা। এনসিপির কিছু নেতা একসময় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এই বিষয় তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়।
এনসিপির নেতারা বলছেন, তাঁরা রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার চাইছেন। দলের সাংগঠনিক বিস্তার না হলে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এনসিপির সাংগঠনিক সক্ষমতা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই এনসিপিকে জোটের রাজনীতি করতে হচ্ছে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ৯ দফার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক আবদুল কাদের এই জোটের কড়া সমালোচক। গত ২২ এপ্রিল তার ফেসবুক পোস্টে লেখা হয়, “ওপরে–ওপরে পার্টি, ভেতরে–ভেতরে ‘প্রক্সি উইং’—এনসিপির অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে দল হিসেবে এনসিপির ভবিষ্যৎ কী?”
এনসিপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, এনসিপি ও জামায়াতের মতাদর্শ ভিন্ন। সাংগঠনিক সক্ষমতা না থাকায় জোট করতে হচ্ছে। বর্তমানে বিএনপির বিপরীতে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটই সক্রিয়।
জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকলেও এনসিপির মৌলিক নীতি ভিন্ন—এটি প্রমাণ করতে গত ৯ এপ্রিল সংসদে তারা অবস্থান তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের বিল উত্থাপিত হয়। জামায়াত আপত্তি জানালেও এনসিপি বলে, তাদের কোনো আপত্তি নেই।
জোট নিয়ে পদত্যাগী নেতা–কর্মীদের দলে ফেরানোর চেষ্টাও চলছে। এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, পদত্যাগীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কথাবার্তা হচ্ছে। তবে কেউ ফিরছেন কি না, এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই।






