নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে আসা পূর্ব মেদিনীপুরের সন্তান শুভেন্দু অধিকারী দীর্ঘ তিন দশকের প্রচেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে পরবর্তীতে ওই পৌরসভার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ আসন থেকে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রবেশ করেন শুভেন্দু। তাঁর এই পদারোহনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পূর্ব মেদিনীপুরের দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রিত্ব লাভ করলেন তিনি। এর আগে ১৯৬৭ সালে এই জেলারই অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, যিনি ছিলেন কলকাতার বাইরে থেকে আসা শেষ মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর পূর্ববর্তী তিনজন মুখ্যমন্ত্রী—বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ ও প্রফুল্লচন্দ্র সেনের শিকড় ছিল বর্তমান বাংলাদেশে। উল্লেখ্য, বিধানচন্দ্র রায় নিজে সেখানে জন্ম না নিলেও তাঁর পিতা সাতক্ষীরার বাসিন্দা ছিলেন।

১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের শুরুর দিকেই দলটিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। বাম ফ্রন্টের বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষ এক দশকে তিনি ছিলেন তাঁর পাশে। বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেন শুভেন্দু। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার একটি শিল্পগোষ্ঠীর রাসায়নিক কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। তবে এই আন্দোলনের সময় সিআইডি অভিযোগ করে যে, শুভেন্দু মাওবাদীদের অস্ত্র সরবরাহ করেছেন যাতে তারা বাম ফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালাতে পারে।

২০১০ সালে জমি অধিগ্রহণের ব্যর্থতার কারণে ইন্দোনেশিয়ার শিল্পগোষ্ঠীটি আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়ার কথা জানালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারীর নামও আলোচনায় আসে। এর মাধ্যমে রাজ্যের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। ২০০৯ সালে তমলুক আসন থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়ে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ মন্ত্রিসভায় গ্রাম উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই ২০১৬ সালে তিনি নন্দীগ্রাম আসন থেকে বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করেন এবং জয়লাভ করেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভায় প্রথমে পরিবহনমন্ত্রী এবং ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেচ ও জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলান।

তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় মূলত ক্ষমতার লড়াইকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, হলদিয়া বন্দর অঞ্চলের আর্থিক প্রভাব ও ক্ষমতার লড়াই এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি ২০১৪ সালে সাংবাদিক ম্যাথিউ স্যামুয়েলের গোপন ক্যামেরায় অর্থ গ্রহণের অভিযোগ সামনে এলে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দুটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা মামলা শুরু করে। সম্প্রতি তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার খবরের পর ওই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া রাজ্যের ‘চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি’র সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে বলে অভিযোগ।

২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর হাত ধরে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। নিজেকে অমিত শাহর লোক হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুভেন্দুকে নিয়ে বিজেপির কিছু পুরনো নেতার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ থেকে বিজেপিতে আসা এক নেতা শুক্রবার এই প্রতিবেদককে বলেন, “শুভেন্দুকে নিয়ে আমাদের একটাই চিন্তা। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশিক্ষণে বড় হয়েছেন। আমাদের সংগঠনের সঙ্গে তাঁর বিশেষ পরিচয় নেই, সাধারণত নিজেকে অমিত শাহর লোক বলেই পরিচয় দেন। সংগঠনের সঙ্গে তেমনভাবে মিশতেও চান না। সংগঠন ও সরকারের সম্পর্ক তাই কী হবে, তা নিয়ে আমরা সামান্য উদ্বেগে আছি।”

উল্লেখ্য, শুভেন্দুর বাবা ও প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা শিশির অধিকারী এবং তাঁর ভাইয়েরাও একইভাবে কংগ্রেস ও তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। বিজেপিতে যোগদানের পর শুভেন্দুর বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুবার পরাজিত করা—প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে এবং দ্বিতীয়বার ২০২৬ সালে ভবানীপুরে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস উভয় নির্বাচনের ভোট গণনা নিয়ে অভিযোগ তুলেছে এবং ২০২১ সালের নির্বাচন নিয়ে মামলা বর্তমানে সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

২০২৬ সালের প্রচার চলাকালীন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। জয়ের পর তাঁকে বলতে শোনা গেছে, “এটা হিন্দুদের জয়।” পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে আসা মানুষদের ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা যেভাবে তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মানুষকে ফেরত পাঠাচ্ছেন, তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো, নাগরিক পঞ্জি চালু করা এবং আসামের ধাঁচে ‘ডিটেনশন সেন্টার’ বা বন্দিশিবির তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে রাজ্যের মানুষের মধ্যে একদিকে যেমন উদ্বেগ, অন্যদিকে এক শ্রেণির সমর্থকের মধ্যে উচ্ছ্বাস রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেন, তা নিয়ে এখন কৌতূহলী পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা বিশ্ব এবং উপমহাদেশের বাঙালিরা।