স্বৈরাচারী বা অপরাধী শাসনের পতনের পর সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি হলো—যারা এই শাসনের হয়ে হত্যা, নির্যাতন বা গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের প্রতি কী আচরণ করা হবে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এ প্রশ্নের কোনো সহজ সমাধান নেই। নাৎসি-পরবর্তী জার্মানি কিংবা আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা—প্রত্যেক দেশই এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটি জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত এবং প্রায়শই ভণ্ডামিতে আচ্ছন্ন ছিল।

এখন এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি সিরিয়া। সম্প্রতি ৪০ বছর বয়সী আমজাদ ইউসুফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০১৩ সালে দামেস্কের তাদামন এলাকায় তিনি চোখবাঁধা অবস্থায় অন্তত ২৮৮ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিককে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। ঘটনাটি আরও ভয়াবহ হয় যে, হত্যাকারীরাই পুরো ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করে রেখেছিল, যা পরে বিশ্বব্যাপী প্রকাশিত হয়।

ইউসুফ ছিলেন বাশার আল-আসাদের শাসনামলে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তা। তাঁর বিচার হওয়া উচিত—এতে ভুক্তভোগীদের পরিবার কিছুটা ন্যায়বিচারের অনুভূতি পাবে। কিন্তু সমস্যা এখানে শেষ হয় না। ইউসুফ একা নন; তাঁর মতো আরও অনেকে রয়েছে, যারা একই ধরনের বা আরও বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িত।

আরও বড় উদ্বেগ হলো, বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকার কিছু সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রেখেছে। সরকারের যুক্তি পরিচিত: ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে শার্ল দ্য গল এমন ধারণা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন যেন জার্মান দখলের সময় প্রায় সব ফরাসিই প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ ছিল। বাস্তবে অনেকে ভিশি সরকারের সহযোগী ছিল, কিন্তু তাদের বিচার সীমিত রাখা হয়।

পশ্চিম জার্মানির প্রথম চ্যান্সেলর কনরাড আদেনাউয়ার, যিনি নিজে নাৎসি ছিলেন না, যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে বাস্তববাদী অবস্থান নেন। তিনি অনেককে মুক্তি দেন এবং কয়েকজনকে সরকারে স্থান দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ‘যদি পরিষ্কার পানি না থাকে, তবে নোংরা পানিও ফেলে দেওয়া যায় না’। অর্থাৎ বিকল্প না থাকলে পুরোনো লোকদের কাজে লাগাতে হয়।

এই অবস্থান নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে, অপরাধী শাসন পতনের পর সবচেয়ে বড় সমস্যা কে অপরাধী এবং কাদের বিচার করা সম্ভব। হিটলারের জার্মানিতে লাখ লাখ মানুষ ইহুদিদের নিপীড়ন ও হত্যার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। শুধু খুনি নয়; আইনপ্রণেতা, অধ্যাপক, সৈনিক, এমনকি রেলওয়ে কর্মচারীরাও এই অপরাধযন্ত্রের অংশ ছিল।

অতিরিক্ত শুদ্ধি অভিযান চালালে সমাজ ভেঙে পড়তে পারে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর পুরোনো শাসনের লোকদের ব্যাপকভাবে বাদ দেওয়ায় প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয় এবং পরিস্থিতি অস্থির হয়।

এ কারণে ১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেয়। তারা শুধু নাৎসি জার্মানি ও জাপানের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করে—নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রায়ালে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, করপোরেট জগৎ বা সামরিক বাহিনীর অসংখ্য মানুষ শাস্তির বাইরে থেকে যায়।

এই বিচারগুলো নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। অনেকে এগুলোকে ‘বিজয়ীর বিচার’ বলেছেন। তাঁদের মতে, জার্মানি বা জাপানের নিজস্ব আদালতে বিচার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তখন সেই দেশগুলোর বিচারব্যবস্থা এত ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে নিরপেক্ষ বিচার সম্ভব ছিল না।

দ্য গল ও আদেনাউয়ারের মতো নেতারা বুঝেছিলেন, ভেঙে পড়া সমাজকে পুনর্নির্মাণে পুরোনো, এমনকি কলঙ্কিত এলিটদেরও কিছুটা ব্যবহার করতে হয়। পরে শীতল যুদ্ধ শুরু হলে পুরোনো শত্রুরা নতুন মিত্র হয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পিছিয়ে যায়।

তবে জার্মানিতে ১৯৬০-এর দশকে নাৎসি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আবার বিচার শুরু হয়। দেশ তখন স্থিতিশীল ছিল। তবু সেই বিচারও আংশিক ছিল। কিছু ভয়ংকর অপরাধী শাস্তি পেলেও অনেকে শাস্তি এড়ায়।

এই অভিজ্ঞতা থেকে এক কঠিন সত্য উঠে আসে—সম্পূর্ণ বা নিখুঁত ন্যায়বিচার প্রায় অসম্ভব।

তাই শাস্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতীতকে সৎভাবে স্বীকার করা এবং স্মরণ রাখা। ভুক্তভোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় অপমান হলো তাদের ওপর হওয়া অন্যায় ভুলে যাওয়া। কিন্তু এই স্মৃতি ও আত্মসমালোচনা গড়তে সময় লাগে।

ইয়ান বুরুমা ডাচ বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ, প্রাবন্ধিক ও লেখক

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ