নির্বিচার সেচের জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়ে গেছে, ফলে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে এসেছে। এখন আর সেই পানি আগের স্তরে ফিরে আসছে না। এই পরিস্থিতি হঠাৎ হয়নি। পানি উত্তোলনের ক্ষেত্রে সুশাসন বলতে আমরা যেটা বুঝে থাকি; তাতে একটা জবাবদিহি, একটা স্বচ্ছতা কিংবা দায়িত্ববোধ থাকে। সেটা এখানে অনুপস্থিত।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর নির্দেশ ছিল। কিন্তু নির্দেশ অমান্য করে অনেক বেশি সংখ্যক গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তিগত মালিকানায় আরও নলকূপ চলছে। রাজশাহীতে একটি পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের গর্তে কিছুদিন আগে এক শিশু পড়ে মারা যায়, যা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছিল। ব্যক্তিগত মালিকানায় নলকূপ চালানোর ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা অনেক কম থাকে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি ‘সংকটাপন্ন’ ঘোষণার পরও বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না। বাংলাদেশ পানি আইন এবং বিধিতে এ অঞ্চলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আছে। কিন্তু এলাকায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পানি উত্তোলন ও ব্যবসা নিজেদের মতো করে চালিয়ে যাচ্ছেন। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাত এখানে ততটা শক্তিশালী নয়। আইনের বিধি মেনে তারা কেউ চলছে না, ফলে এখানে একটা ‘ওয়াটার লর্ডশিপ’ গড়ে উঠেছে। এই লর্ডশিপ পানিসংকটের প্রধান চ্যালেঞ্জ। কেউ আইন মানছে না, সরকারকে এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।

যদি ওই ১১ থেকে ১২ হাজার গভীর নলকূপই চলত, তাহলে এত তাড়াতাড়ি সংকট দেখা দিত না। এখানে সরকারের আইন প্রয়োগ সঠিকভাবে করতে হবে।

সুশাসনের পাশাপাশি বরেন্দ্রের পানিসংকট মোকাবিলায় দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। খাঁড়ি ও পুকুরগুলো খনন-পুনর্বাসন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা দরকার। বরেন্দ্র উঁচু এলাকা হওয়ায় সেখান থেকে পানি নিচের দিকে প্রবাহিত করা যায়। খাঁড়িতে ‘ক্রসডেম’ ব্যবহার করে পানি আটকে রাখতে হবে। বর্ষায় আমন ধানের সময় খরা পড়ে, তা নদীর পানি দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। বোরো ধানের শুরুতে পুকুর ও খাঁড়ির পানি ব্যবহার করে পরে প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ পানি তোলতে হবে। কখনোই নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যাবে না।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে বৃষ্টির পানি ফিল্টার করে মাটির নিচে পাঠাতে হবে। ভূ-উপরিভাগের সব ধরনের পানির উৎস কাজে লাগাতে হবে। সচেতনতা বাড়িয়ে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করতে হবে।

চৌধুরী সারওয়ার জাহান: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়