বিয়ের ১১ বছর পর ফারজানা ইসলাম প্রথম সন্তানের মুখ দেখেন। ছেলে ফাইয়াজ হাসান তাজিমের নামে তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম রাখেন ‘তাজিম এর আম্মু’। ৮ মাস ১৮ দিন বয়সী এই তাজিম গত ২২ এপ্রিল হামে মারা যায়।
ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির এই একমাত্র সন্তানের জন্ম হয় টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ পদ্ধতিতে। এই পদ্ধতিতে নারী ও পুরুষের প্রজনন কোষ সংগ্রহ করে একটি টেস্টটিউবে নিষিক্ত করা হয়। তারপর নিষিক্ত ডিম্বাণু বা ভ্রূণকে মায়ের জরায়ুতে স্থানান্তর করে গর্ভধারণ নিশ্চিত করা হয়। এটি ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সন্তান জন্মের পর দম্পতি তাজিমকে নিয়ে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন।
গত মার্চ থেকে তাজিমের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই শুরু হয় ফারজানা ইসলামের। প্রথমে নিউমোনিয়া, তারপর পাতলা পায়খানা এবং হামে আক্রান্ত হয় ছেলে। চাঁদপুর থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে তাকে ভর্তি করে চিকিৎসা করান।
গতকাল বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে ফারজানা ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। মেসেঞ্জারে ছেলের একটি ছবি পাঠিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এটা ছিল আমার বাবুর জীবনের শেষ হাসির ছবি’। তিনি বলেন, নিউমোনিয়ার চিকিৎসার খরচের বাইরে ১৭ দিন শুধু হামের চিকিৎসায় বিভিন্ন হাসপাতালে চার লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে।
ফারজানা ছেলের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। ১৮ মার্চ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত তাজিমকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করান। পিআইসিইউ এবং সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা শেষে ২৫ মার্চ বাড়ি ফেরেন। লঞ্চে বাবার কোলে ছেলে হাসার ছবি তোলেন। এর আগে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালেও ভর্তি করেছিলেন, কিন্তু কয়েকটি শিশুর মৃত্যুতে ভয় পেয়ে ছেড়ে আসেন।
২৫ মার্চ বাড়ি ফেরার চার দিন পর আবার জ্বর শুরু হয়। চিকিৎসকের চেম্বারে দেখানোর পাশাপাশি বাড়িতে চিকিৎসা চলে। অবস্থা খারাপ হলে ৫ এপ্রিল থেকে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি শুরু। অ্যাম্বুলেন্সে ছেলেকে নিয়ে প্রথমে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে যান, বেড না পেয়ে মিরপুরের আলোক হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে পিআইসিইউ এবং ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলে। পরে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার হয়, বেড না পেয়ে ধানমন্ডির সুপারম্যাক্স হেলথ কেয়ার লিমিটেডে ভর্তি করেন।
ফারজানা জানান, সুপারম্যাক্সে ক্যানোলায় ছেলের পা ফুলে শক্ত হয়ে যায়। সেখানে পিআইসিইউতে মা-বাবার থাকার সুযোগ ছিল না। তাই ১৮ এপ্রিল আবার প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানেই পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছেলে মারা যায়।
একমাত্র সন্তান হারিয়ে ফারজানা-হেলাল দম্পতি দিশেহারা। বিভিন্ন হাসপাতালের নথি থাকলেও শেষ ছাড়পত্রের নথি হারিয়ে যায়। ফারজানা বলেন, হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যুর কারণ লেখা নথিটা অ্যাম্বুলেন্সে রাখা ছিল, সন্তানের মরদেহ নামার সময় কারও মনে ছিল না।
ফারজানা লিখেছেন, দুই মাস ধরে নিষ্পাপ শিশুরা মরে যাচ্ছে, এ নিয়ে সংসদে আলাপ নেই। কারও কোনো দায় নেই। কেউ ব্যর্থতা স্বীকার করছে না। সব দোষ মা ও শিশুর। শিশুরা এই দেশে জন্ম নিল কেন? মা সন্তানের জন্ম দিল কেন?
ফেসবুকে ফারজানা ছেলের পায়ের ছবি বা স্মৃতির কথা লিখে চলেছেন। তাজিমের হামের প্রথম ডোজ টিকার তারিখ ছিল ১ মে, তার আগেই মারা যায়। টিকার কার্ড ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। অন্য শিশুর হামে মৃত্যুর পোস্ট শেয়ার করে লিখেছেন, তাজিমের চোখের চাহনি ভুলতে পারছেন না, যা থেকে তার কষ্ট বোঝা যেত।






