অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি নাগরিকদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধের পাশাপাশি খুন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধও তখন বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পান। তাঁদের অনেকে অপরাধজগতে ফিরে আসেন। এলাকাভিত্তিক আধিপত্যের লড়াইয়ে এই পেশাদার অপরাধীরা জড়িয়ে পড়ায় ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়। এই বাস্তবতার মুখে বিএনপি সরকার আইনশৃঙ্খলার উন্নতিকে তিনটি অগ্রাধিকারের একটি হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আড়াই মাস কেটে গেলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত জোরালো অভিযান দেখা যায়নি, ফলে নাগরিক উদ্বেগ বাড়ছে।
মুক্তকণ্ঠের খবর জানাচ্ছে, গত ২৩ মাসে রাজধানীতে ২৩টি আলোচিত অপরাধের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে পেশাদার সন্ত্রাসীরা জড়িত। এর মধ্যে ৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রয়েছে। সর্বশেষ গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী নাঈম আহমেদকে। খুনোখুনির বাইরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি, বোমা বিস্ফোরণ, কুপিয়ে জখম, মহড়া ও হুমকির ঘটনাও ঘটেছে।
ঢাকার অপরাধজগতের আন্ডারওয়ার্ল্ড মানচিত্রে ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, হাতিরঝিলসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর আধিপত্য নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বের ফলে অপরাধের মাত্রা অনেক বেড়েছে। চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে শীর্ষ অপরাধীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জামিনে মুক্তির পর তাঁদের অনেকে দেশে থেকে, আবার অনেকে বিদেশ থেকে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন। পোশাক কারখানার ঝুট, বাসাবাড়ির ময়লা, ডিশ ও ইন্টারনেট, যানবাহনে চাঁদা, কোরবানির পশুর হাট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজ ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজির সঙ্গে পেশাদার সন্ত্রাসীদের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে, কোথাও কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী স্থানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধজগতের ক্ষমতার পালাবদল চলছে।
অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পেশাদার অপরাধী গোষ্ঠীগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় শীর্ষ অপরাধীদের টিকে থাকার জন্য রাজনৈতিক প্রশ্রয় দরকার, আবার অসৎ রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থানের জন্য অপরাধীদের প্রয়োজন হয়। আশঙ্কাজনক যে, পেশাদার অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর যোগসাজশ ঘটছে। অপরাধবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জামিনে মুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, আত্মগোপনে থাকা নির্দেশদাতা, স্থানীয় গ্যাং, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও চাঁদাবাজির বাজার—এই পাঁচ স্তর ভাঙতে না পারলে রাজধানীতে খুন, গুলি ও আতঙ্কের চক্র থামানো কঠিন।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে বিএনপি সরকার পেয়েছে। এটি দ্রুত বদলানো সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত সমন্বিত পদক্ষেপ অপরাধীদের নিবৃত্ত করতে পারে। ১ মে থেকে ঢাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হলেও এখনও পেশাদার অপরাধীদের গ্রেপ্তারের খবর নেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করতে হবে শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন জরুরি।






