সরকার দেশের করব্যবস্থায় একটি নতুন মডেল নিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি উল্লেখ করেন, কর ফাঁকি এবং করের জাল না বাড়ার মূল কারণ হলো নাগরিকের সঙ্গে করের সংযোগের অভাব। নাগরিকেরা সেবা না পেলে কর দিতে আগ্রহী হন না। নতুন এই মডেলে কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে আনা হবে এবং করদাতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযুক্তি বাড়াতে কর জমা দেওয়ার পর একটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্র দেওয়া হবে। এই প্রাপ্তি স্বীকারপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে বাজেটের কত শতাংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় করা হচ্ছে, যা নাগরিকদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে সাহায্য করবে।

দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর যৌথ আয়োজনে ‘ডিজিটাল অ্যাকাউন্টিং ও রাজস্ব আহরণ’ শীর্ষক প্রাক্‌-বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন আইসিএবির সভাপতি এন কে এ মবিন। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ এবং ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর হেড অব অনলাইন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া শিহাবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন, যিনি অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরও জানান, অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে এসএমই নীতিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। আঞ্চলিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে এবং এ জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকল ও বস্ত্রকলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠনের কাজও চলছে। তিনি কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন যথাযথভাবে করার জন্য আইসিএবিকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।

সেমিনারে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীনেতারা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। হিসাব ও করব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশন করা হলে দুর্নীতি পুরোপুরি দূর না হলেও সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং রাজস্ব ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাঁরা ধাপে ধাপে হিসাব ও করব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দেন, যাতে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার না হন।

বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের শিল্পায়নের নীতিসহায়তার কথা স্মরণ করে বলেন, “আমরা কি ওই পথে আছি এখন? আমার মনে হয়, নাই। এখন আমাদের ব্যবসায় ধস নামছে। শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে। ব্যবসার জন্য যে সুযোগ বা পরিবেশ দরকার, সেটা সরকার নিশ্চিত করতে পারছে না। নীতি সংস্কার হচ্ছে না।” তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, “আপনি কর না পেলে তাহলে ধরপাকড় করেন; জেলে দেন। কিন্তু আমার করের টাকাটা নিয়ে করেন কী? আপনি যেভাবে আমাকে ধরপাকড় করে কর আদায় করেন, আমার করের টাকা কীভাবে খরচ করেন, সেটার জবাবদিহি দরকার। এ জন্য একটা সেল করা উচিত। আপনি সেতু বানাবেন রাস্তা ছাড়া। আর আমারে বলবেন, যে টাকা নাই। সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। অর্থের অপচয় বন্ধ করতে হবে।”

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ অভিযোগ করেন, “জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তিন বিভাগ আমাদের নাজেহাল করছে। বিভাগ তিনটি যদি ঢেলে সাজানো না হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পারব না। আমলাতন্ত্রের জন্য বিদেশি অনেক বড় প্রকল্প ফিরে গেছে। আবার বিনিয়োগ করেও অনেকে নাজেহাল হয়েছে। এই আমলাতন্ত্র কমাতে হলে কর ও হিসাবব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন জরুরি।”

মেট্রো চেম্বারের সভাপতি কামরান টি রহমান পরামর্শ দেন, কর ও হিসাবব্যবস্থাকে একসঙ্গে ডিজিটালাইজেশন না করে ৩-৫ বছরে ধাপে ধাপে এটি করা উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে না পড়েন। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে রাজস্ব আয়ের এক-তৃতীয়াংশ প্রত্যক্ষ কর থেকে আসে। এটিকে দুই-তৃতীয়াংশে নিতে হলে বিদ্যমান টিআইএন দিয়ে হবে না, করজাল বাড়াতে হবে। করজাল কেন বাড়ছে না, তা এনবিআরকে খতিয়ে দেখতে হবে।

সভায় আইসিএবির সভাপতি এন কে এ মবিন বলেন, “দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। আগামী বাজেটের আকার হবে প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা মনে করি সরকারকে প্রত্যক্ষ কর থেকে রাজস্ব বাড়াতে হবে, তাহলে রাজস্ব আহরণ হবে টেকসই। তবে অর্থনীতিতে ভ্যাট ফাঁকি, কর ফাঁকির চর্চা থাকলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব হবে না।” আইসিএবির কাউন্সিল সদস্য সাব্বির আহমেদ মূল প্রবন্ধে বলেন, জবাবদিহিমূলক আর্থিক কাঠামো গড়ে তুলতে সরকারকে প্রচলিত কাগজভিত্তিক হিসাব ও প্রতিবেদন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থা চালু হলে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করা, আর্থিক তদারকি জোরদার করা এবং কর ফাঁকি ও জালিয়াতির সুযোগ কমানো সম্ভব হবে।

সভায় এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন এবং অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার মালাসহ অন্যান্যরা বক্তব্য দেন।