একই খেতে তিন রকম ধান। এক জাত পেকে লুটিয়ে পড়েছে, আরেকটি সদ্য পেকে দাঁড়িয়ে আছে, তৃতীয় জাতের শিষ বের হয়ে বাতাসে দুলছে। দূর থেকে সবুজ ধানের মতো মনে হয়, কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় সবুজের মধ্যে আগে-পরে দুই জাতের পাকা ধান।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) নির্ধারিত পরিবেশকের কাছ থেকে ‘ব্রি ধান–৮৮’ ভিত্তিবীজ কিনে চাষ করায় রাজশাহীর চাষিরা প্রতারিত হয়েছেন। তাঁরা বলছেন, তাঁদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। বিএডিসির কর্মকর্তারা জানান, ব্রি ধান–৯২–এর বীজ এর সঙ্গে মিশে গেছে। কীভাবে এমন হলো, তদন্ত চলছে।

চাষিদের অভিযোগ, ‘ব্রি ধান–৮৮’ ভিত্তিবীজ চাষ করে তারা প্রতারিত। ভিত্তিবীজ বলতে বিএডিসির গবেষণা মাঠ থেকে প্রথমবার কৃষকদের কাছে বিক্রি করা বীজ বোঝায়। অন্তত তিন বছর এর গুণ থাকার কথা; কিন্তু প্রথম বছরেই সমস্যা। সরকারিভাবে ৭২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে এই বীজ। চাহিদা বাড়ায় পরিবেশকদের কাছ থেকে চাষিরা ৭৬ টাকা কেজি দিয়ে কিনেছেন। এক বিঘায় পাঁচ কেজি বীজ লাগে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার নতুন কসবা গ্রামের মোর্শেদ আলী (৪০) হরিপুর মাঠে চার বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করেছেন। তার খেতে তিন রকম ধান: একটা পেকে নিচে পড়েছে, আরেকটা সদ্য পেকেছে, তার ওপর নতুন শিষ বেরোচ্ছে। প্রথম পেকা জাতের গাছ নরম খড়ের মতো ঝুলে পড়েছে।

মোর্শেদ আলী বলেন, হরিপুর ইউনিয়নের বিএডিসির পরিবেশক আনারুল ইসলামের কাছ থেকে বীজ নিয়েছেন। সমস্যা দেখে একাধিকবার গিয়েছেন। তিনি চাষিদের সইসহ দরখাস্ত লিখে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পাইটের (শ্রমিকের) কাছে গেলছুনু। ওরা বুইলছে এই ধান কাটতে পাইরবে না। এবার ধানের আশা আমার একদম নাই। গত বছর আমি সাড়ে ২৭ মণ হারে এই ধানের ফলন পাইচি। আমার দেখাদেখি এবার মাঠের অনেকেই করেছে। ওরা আমাক বিশ্বাস করে। আমি যে ধান লাগাই, অন্য চাষিরাও সেই ধানই করে। এবার আমার সঙ্গে ওহারেও সর্বনাশ হয়্যা গেলছে।’

পবা উপজেলার মুরারিপুর গ্রামের চাষি মাসুদ রানা (৩৩) তিন বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করেছেন—দেড় বিঘা গোদাগাড়ী উপজেলার উদপাড়ায়, বাকি দেড় বিঘা পবার শিতলাই মাঠে। তাঁর খেতে একটা পেকেছে, একটা শিষ মাঝারি, আরেকটার শিষ বেরোচ্ছে। পাকা ধান কাটতে শ্রমিক নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা জবাব দিয়েছে। তারা বলেছে, কাটলে সব একসঙ্গে কাটতে হবে, বেছে কাটা যাবে না। মাসুদ রানা জানান, তিন বিঘায় ৩৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে সার-পানিতে, ধার-দেনা করে। তিনি বলেন, ‘আমি শ্যাষ হয়্যা গেলছি। ভাই, আপনারা একটু কিছু করেন।’

চাষিরা হরিপুর ইউনিয়নের ডিলার আনারুল ইসলামের কাছ থেকে বীজ কিনেছেন। আনারুল বলেন, প্রায় ২০ জন চাষিকে বীজ বিক্রি করেছেন, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। তিনি চাষিদের সই নিয়ে বিএডিসির উপপরিচালকের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছেন।

বিএডিসি রাজশাহীর উপপরিচালক এ কে এম গোলাম সারওয়ার বলেন, দু-একজন তাঁর কাছে এসেছেন। তিনি হরিপুর মাঠ দেখেছেন, দুই রকম ধান দেখেছেন। ঢাকায় ঊর্ধ্বতন ও প্রধান কার্যালয়ে জানিয়েছেন। রাজশাহী ছাড়া আরও দু-এক জায়গায় এমন হয়েছে, সেখানে তদন্ত চলছে। রাজশাহীতে ব্রি ধান–৯২ ও ৮৮ মিশে গেছে বলে মনে হচ্ছে। ভিত্তিবীজে এমন হওয়ার কথা নয়, কিন্তু কোথায় মিশেছে তা বোঝা যাচ্ছে না।