চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের প্রথম লেগে আক্রমণের দাপট দেখিয়ে জয়লাভ করেছিল পিএসজি। গতকাল রাতে ফিরতি লেগে তারা রক্ষণের দুর্দান্ত প্রদর্শন করে ম্যাচটি নিশ্চিত করেছে। খেলা শুরুর মাত্র ৩ মিনিটের মধ্যেই গোল করে এগিয়ে যায় পিএসজি। দুই লেগের মোট গোলসংখ্যায় ৬–৪ এর সুবিধায় তারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে নেয়। ঘরের মাঠে দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা বায়ার্ন মিউনিখকে উলটে জিততে হলে অসাধারণ কিছু করতে হতো।
জার্মান ক্লাবটি চরম চেষ্টা করলেও শেষ মুহূর্তে হ্যারি কেইনের গোল শুধু ব্যবধান কমাল, সেমিফাইনাল থেকে বিদায় ঠেকাতে পারল না। ম্যাচ শেষে দলের প্রদর্শন নিয়ে খুশি হয়েছেন পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে। তরুণ তারকা দেজিরে দুয়ে নিজেদের রক্ষণের প্রশংসা করেছেন। এই জয়ের মাধ্যমে ফরাসি ক্লাবটি এখন ইতিহাসের এক পাতায় রিয়াল মাদ্রিদকে ছোঁয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
গতকাল রাতে ম্যাচ শেষে সম্প্রচারক চ্যানাল ‘ক্যানাল প্লাস’কে এনরিকে বলেছেন, “আজ রাতে প্রমাণ করেছি দল হিসেবে আমরা কেমন। রক্ষণ আর আক্রমণ—দুদিকেই আমরা পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছি। কোচ হিসেবে এমন পারফরম্যান্স দেখা ছিল দারুণ এক অনুভূতি।”
পিএসজি উইঙ্গার দেজিরে দুয়ে নিজেদের রক্ষণের প্রশংসা করে বলেছেন, “আমরা সব সময় জাদুকরি বা অসাধারণ ফুটবল খেলে জিততে পারি না। আজ আমাদের অনেকক্ষণ রক্ষণ সামলাতে হয়েছে, আর সেটা আমরা খুব ভালোভাবেই করেছি।” বায়ার্নকে বিদায় করে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠেছে পিএসজি।
দলের রক্ষণে সংহতি ও দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন উইলিয়ান পাচো। ইকুয়েডরের এই ডিফেন্ডার ম্যাচে নিজের ছয়টি দ্বৈরথের সব কটিতেই জয়লাভ করেছেন। ইনজুরিতে থাকা আশরাফ হাকিমির অনুপস্থিতিতে ডান প্রান্তে অসাধারণ খেলেছেন ওয়ারেন জায়েরে-এমেরি। মাত্র ২০ বছর বয়সী এই ফরাসি মিডফিল্ডারকে অনেকে মৌসুমের সেরা খেলোয়াড় মনে করছেন।
আক্রমণ ও রক্ষণের সমন্বয়ে এই জয় পিএসজিকে ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ২০১৯ সালে লিভারপুলের পর টানা দুই মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ওঠা প্রথম দল হয়েছে পিএসজি। আগামী ৩০ মে বুদাপেস্টের ফাইনালে আর্সেনালকে হারালে চ্যাম্পিয়নস লিগে শিরোপা ধরে রাখা দ্বিতীয় দল হবে তারা। এখন পর্যন্ত এই কীর্তি গড়েছে শুধু রিয়াল মাদ্রিদ। জিনেদিন জিদানের কোচিংয়ে ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা তিনবার শিরোপা জিতেছিল মাদ্রিদের ক্লাবটি।
ফাইনাল জয় করলে কোচ হিসেবে তৃতীয়বার ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের কাতারে নাম লিখবেন লুইস এনরিকে। এর আগে ২০১৫ সালে বার্সেলোনার কোচ হিসেবে এবং গত মৌসুমে পিএসজির হয়ে শিরোপা জিতেছেন তিনি। তৃতীয়বার এই সাফল্যে এনরিকে জায়গা পাবেন জিদান, পেপ গার্দিওলা, বব পেইসলি ও কার্লো আনচেলত্তির পাশে।
পিএসজি ফাইনালে উঠার পর ক্লাবের সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি বলেছেন, “আমাদের দারুণ এক তরুণ দল আছে, যেখানে সবাই নিজেদের সর্বোচ্চটা দিচ্ছে। আর আমাদের আছে বিশ্বের সেরা কোচ।” খেলাইফির মুখের হাসি যেন বলে দিচ্ছিল, কিলিয়ান এমবাপ্পে, নেইমার ও লিওনেল মেসিদের যুগ পেরিয়ে পিএসজি এত সফলভাবে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে, সেটা হয়তো তিনিও কল্পনা করেননি।
একসময় মনে হয়েছিল, গত মৌসুমের পর দলকে শক্তিশালী না করার সিদ্ধান্ত বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মাকে ম্যানচেস্টার সিটিতে বিক্রি করার পর তার মানের বিকল্প না পাওয়ায় শঙ্কা বেড়েছিল। তবে গত মৌসুমে মিউনিখে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল জিতা সেই দলের শুরুর একাদশের ৯ জনই বুধবার একই স্টেডিয়ামে খেলেছেন। অনুপস্থিত ছিলেন শুধু দোন্নারুম্মা ও আশরাফ হাকিমি।
লুইস এনরিকের নেতৃত্বে ঘরের মাঠে প্রথম লেগের সব নকআউট লড়াই জিতেছে পিএসজি। সাত মৌসুমে তৃতীয়বার ফাইনালে উঠল তারা। আর্সেনালের বিপক্ষে ফাইনালেও অনেকে পিএসজিকে এগিয়ে রাখছেন। কারণ তারা প্রমাণ করেছে, শুধু আক্রমণ নয়, কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ ও জমাট রক্ষণ গড়তেও তারা দক্ষ।
ফরাসি টেলিভিশনে আলোচক ও আর্সেনালের সাবেক তারকা সামির নাসরি বলেছেন, “পিএসজির এই দল ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো। কারণ, কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে টিকে থাকতে হয় এবং ভালোভাবে রক্ষণ সামলাতে হয়, সেটাও তারা দেখিয়ে দিয়েছে।”






