করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে কতটা গভীরভাবে পড়েছে, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের হার বৃদ্ধি থেকে স্পষ্ট। এই পটভূমিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড–ডে মিল চালু করা অত্যন্ত কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ। প্রকল্প শুরুর পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে বটে, কিন্তু অনেক জায়গায় খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে মিড–ডে মিল নামে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি বিদ্যালয়ে সপ্তাহে ছয় দিন দুপুরে খাবার দেওয়া হচ্ছে। খাবারের তালিকায় রয়েছে বানরুটি, সেদ্ধ ডিম, ইউএইচটি দুধ, কলা ও ফর্টিফায়েড বিস্কুট। প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এর সুবিধা পাচ্ছে।
মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু এলাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা খাবারের মান ও পরিমাণে সন্তুষ্ট হলেও অনেক জায়গায় তা সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে কিছু এলাকায় পচা বা কাঁচা কলা, নিম্নমানের বানরুটি ও নষ্ট সেদ্ধ ডিম বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মার্চে চট্টগ্রামের আনোয়ারার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পচা ও কাঁচা কলা দেওয়া হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল মাদারীপুরের কয়েকটি স্কুলে মিড–ডে মিল খেয়ে কিছু শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচিত হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী গত মাসে নরসিংদীতে পরিদর্শনে গিয়ে খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হলেও স্থানীয় এজেন্টদের হাত ধরে সরবরাহে নানা অনিয়ম ঘটছে। কম দামে নিম্নমানের খাদ্য কেনা, আগে থেকে খাবার প্রস্তুত রাখা ও পরিবহনে ত্রুটির কারণে খাবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন অভিযোগও আছে যে সরকারি বরাদ্দ ২৫ টাকা হলেও ১৪ থেকে ১৫ টাকার বানরুটি দেওয়া হচ্ছে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পুষ্টিহীনতা ও ক্ষুধার মতো সংবেদনশীল বিষয় মাথায় রেখে মিড–ডে মিল চালু করা হয়েছে, সেখানে মানহীন খাবার সরবরাহ দুঃখজনক। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। খাবারের মান ও পরিমাণ ঠিক আছে কি না, তা নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা থাকা দরকার। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় খাবারের তালিকা থেকে বানরুটি, কলা ও ডিম পরিবর্তনের যে চিন্তা করছে, তা ভেবেচিন্তে নেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে বিকল্প খাবারে পুষ্টিমান যেন বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী যথার্থই বলেছেন, “মিড–ডে মিল শুধু শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়ায় না, শেখার ফলাফল উন্নত করতেও ভূমিকা রাখে।” এর সুফল এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রাথমিক শিক্ষায় পড়তে শুরু করেছে। সরকার প্রকল্পটি ১৫০ উপজেলা থেকে ৩৪৮টি উপজেলায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা সাধুবাদযোগ্য। প্রাথমিক শিক্ষা ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সময়োপযোগী এই প্রকল্প সফল করতে হবে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহিত খাবারের মান নিয়ে আপসের সুযোগ নেই।






