বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য গত এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতির এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এপ্রিলে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে উঠেছে, যা মার্চ মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমার প্রত্যাশা সত্ত্বেও এটি স্থিতিশীল হয়নি, বরং কিছুটা বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি মার্চের ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে এপ্রিলে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজির পাশাপাশি বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, পোশাক, জ্বালানি-সম্পর্কিত খরচসহ জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

গ্রাম ও শহর উভয় ক্ষেত্রেই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষণীয়। গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি মার্চের ৮ দশমিক ৭২ শতাংশ থেকে এপ্রিলে ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হয়েছে। শহরাঞ্চলে এটি মার্চের ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সংখ্যাগত পার্থক্য ছোট হলেও গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি সামান্য বেশি। এর সামাজিক তাৎপর্য উল্লেখযোগ্য, কারণ গ্রামের নিম্ন আয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের আয় অনিশ্চিত এবং সঞ্চয় কম। তাই তারা শহরের তুলনায় মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা বেশি কষ্টে সামলায়।

গ্রামীণ মূল্যস্ফীতির অভ্যন্তরীণ চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি মার্চের ৮ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ থেকে এপ্রিলে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে গ্রামীণ মানুষ খাদ্যপণ্য ছাড়াও চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত, কৃষি উপকরণ, বিদ্যুৎ, ঘর মেরামত, দৈনন্দিন সেবায় খরচ বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমছে। গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিট খাদ্য ক্রেতা, বাজার থেকে চাল, ডাল, তেল, মাছ, ডিম, সবজি কিনে চলে। তাই খাদ্যমূল্যস্ফীতি তাদের ওপর সরাসরি চাপ ফেলে।

শহরাঞ্চলেও মূল্যস্ফীতি উদ্বেগের কারণ। শহরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি মার্চের ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে এপ্রিলে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ হয়েছে। শহুরে পরিবারের ব্যয়ে বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানি, শিশুর যত্ন এবং বাজারনির্ভর খাদ্য বড় অংশ দখল করে। শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবীরা প্রায় সবকিছু বাজার থেকে কেনে, নিজস্ব উৎপাদন বা পারিবারিক সহায়তা কম। ফলে খাদ্যদাম, ভাড়া ও সেবা খরচ বাড়লে বাজেট ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেতনের কর্মী, পোশাকশ্রমিক, ক্ষুদ্র সেবা খাতের কর্মী, রিকশাচালক, দোকান কর্মচারী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির বিষয় মনে করা যায় না। সুদের হার, ঋণপ্রবাহ বা মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশ সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, জ্বালানি খরচ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িত। তাই খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুতদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে তদারকি, সময়মতো আমদানি সিদ্ধান্ত এবং কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পাইকারি বাজারে অদক্ষতা কমানোর সমন্বিত নীতি দরকার।

নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীরা প্রধান ভুক্তভোগী। তাঁদের জন্য খাদ্যসহায়তা, স্বল্প মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নগদ সহায়তা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তা লক্ষ্যভিত্তিক করে সম্প্রসারণ করতে হবে। শহরে স্বল্প মূল্যের খাদ্য বিতরণ, ভাড়াজনিত চাপ বিবেচনায় নগর দরিদ্রদের সহায়তা এবং নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু করতে হবে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে না পড়ার নজরদারি দরকার। কারণ মূল্যস্ফীতি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি খাবার কমে যাওয়া, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া, সন্তানের শিক্ষা কাটছাঁট ও জীবনমান নেমে যাওয়ার সংকট।

সেলিম রায়হান
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম