ঢাকার সাভারে অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরীকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কাছ থেকে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীন নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও আইনি জটিলতা, পরিচালনা কাঠামো, মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে বিষয়টি বর্তমানে ‘ঝুলন্ত অবস্থায়’ রয়েছে।

বুড়িগঙ্গা নদী ও ঢাকার দূষণ কমাতে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়া পরিশোধন কারখানা বা ট্যানারিগুলো সাভারে অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরে সরিয়ে নেওয়া হয়। শিল্পনগরটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিসিক। কিন্তু জায়গা পরিবর্তন হলেও ট্যানারি বর্জ্যে পরিবেশদূষণ থামেনি। কারণ, চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়।

.

এ ছাড়া শিল্পনগরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ঠিকভাবে করা হয় না। দূষণের কারণে বিশ্ববাজারে ভালো দামে চামড়া বিক্রি করতে পারেন না ব্যবসায়ীরা। তাঁরা এই পরিস্থিতির জন্য বিসিকের ব্যর্থতা ও তদারকির অভাবকে দায়ী করে আসছিলেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি সংস্কারে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একপর্যায়ে চামড়াশিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের চিন্তাও করে তৎকালীন সরকার। কিন্তু কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে এলে চামড়া শিল্পনগরীর সংকটের বিষয়টি নতুন করে সামনে আনেন ব্যবসায়ীরা। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চামড়া শিল্পনগরীর দায়িত্ব বিসিকের কাছ থেকে নিয়ে বেপজার অধীন দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

.

শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক ও বেপজার একাধিক কর্মকর্তারা জানান, বিসিকসহ দেশের ছয়টি বিনিয়োগ সংস্থাকে একীভূত করতে সাবেক শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ২০২৫ সালের এপ্রিলে আট সদস্যের একটি কমিটি করে সরকার। কমিটির প্রথম সভায় চামড়া শিল্পনগরীকে বেপজার অধীন নিয়ে আসার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। কারণ, ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের ইপিজেডে সফলভাবে সিইটিপি পরিচালনায় বেপজার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

কর্তৃপক্ষ বদল কীভাবে হবে, তা ঠিক করতে ওই সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) নজরুল ইসলামকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করে সরকার। এরপর গত এক বছরে বেশ কয়েকটি আন্তসংস্থা সভা হয়। পরে কমিটি শিল্প মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ জমা দেয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে বিষয়টি পুনরায় মূল্যায়ন করে দেখছে।

সংশ্লিষ্ট দুজন কর্মকর্তা জানান, বেশ কিছু জটিলতার কারণে বর্তমানে বিষয়টি ‘ঝুলন্ত অবস্থায়’ রয়েছে। এ বিষয়ে শিল্পসচিব মো. ওবায়দুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেক বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। এগুলো পরিষ্কার হলে সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

.

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চামড়া শিল্পনগরীকে বেপজার অধীন নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো আইনি ভিন্নতা। বর্তমানে চামড়া শিল্পনগরীটি দেশের প্রচলিত শ্রম আইনে চলে। কিন্তু বেপজার নিজস্ব ও আলাদা শ্রম আইন রয়েছে। বেপজার অধীন গেলে শ্রমিকদের বেতনের কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা অনেক বেড়ে যাবে। এই বাড়তি ব্যয়ভার উদ্যোক্তারা বহন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

জমি ইজারা নিয়েও জটিলতা রয়েছে। বিসিকের কাছ থেকে অধিকাংশ ট্যানারিমালিক ৯৯ বছরের জন্য জমি ইজারা (লিজ) নিয়েছেন। অন্যদিকে বেপজার জমি বরাদ্দের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। আবার বেপজা মূলত শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প নিয়ে কাজ করে। কিন্তু সাভারের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ট্যানারি শুধু স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করে। কর্তৃপক্ষ হস্তান্তর হলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা স্পষ্ট নয়।

জানতে চাইলে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কর্তৃপক্ষ বদল নিয়ে সরকারের গঠিত কমিটি সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয়ে পরামর্শ দেবে। এরপর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

.

বর্তমানে চামড়াশিল্প নগরীতে ১৩০টি কারখানা উৎপাদনে রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তাঁরা চামড়াশিল্পের কর্তৃপক্ষ বদলের বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশায় রয়েছেন। জমি ইজারা, কাঁচামালের শুল্কায়ন, শ্রমিকের মজুরি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তাঁদের এসব উদ্বেগ।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সালমা ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা বেপজার অধীন যাওয়ার জন্য রাজি, তবে কিছু বিষয়ে আগে পরিষ্কার হতে হবে। তার আগে স্থানান্তর চাই না।’ তবে বেপজার অধীন গেলে সিইটিপি পরিচালনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে বলে মনে করেন তিনি। সাখাওয়াত উল্লাহ আরও বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয়েছে যে কর্তৃপক্ষ বদল হলেও পুরোপুরি বেপজার আইনে না চলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন শিথিল করা হবে। বেপজার বিশেষ চামড়া শিল্পনগরী নামে নতুন আইনে এটি হতে পারে। এ ছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের মতো বিষয়ে জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’

.

এদিকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বেপজার অধীন গেলে এখানকার শ্রমিকদের অধিকার খর্ব হবে বলে মনে করেন ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ‘ট্যানারিশিল্প দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত খাত। এখানে ৫০ থেকে ৬০ বছরের পরীক্ষিত শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে। তেমন কোনো শ্রম অসন্তোষের ঘটনা নেই। এ অবস্থায় বেপজার অধীন গেছে শ্রম অধিকারের কী হবে। সরকারের কাছে ইতিমধ্যে বিষয়টি জানিয়েছি, আবারও বলব। সার্বিকভাবে আমরা এটিকে সঠিক সিদ্ধান্ত মনে করি না।’

আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, সরকার ও চামড়া শিল্পমালিকদের ভুল নীতির কারণে বর্তমানে চামড়া শিল্পনগরীর এই সংকট তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে হাজারীবাগ থেকে একবার স্থানান্তর করে ছোট ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নতুন পরিস্থিতিতে ছোট অনেক কারখানা অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে। এতে শ্রমিকদের চাকরি হারানোরও ঝুঁকি তৈরি হবে।

.

চামড়া শিল্পনগরীকে নিজেদের অধীন পেতে বেপজাও আগ্রহী নয়। বেপজার কর্মকর্তারা জানান, চামড়া শিল্পনগরী বেপজার অধীন নেওয়ার বিষয়ে সংস্থাটি থেকে আগে কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। বিষয়টি অনেকটা একতরফা বা চাপিয়ে দেওয়ার মতো ছিল। বেপজার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এ বিষয়ে বেশ কিছু কারিগরি (টেকনিক্যাল) ইস্যু রয়েছে। যদি বেপজাকে দেওয়া হয়, তাহলে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ইপিজেডের অধীন কারখানায় শ্রমিকেরা বাইরের কারখানা থেকে বেশি মজুরি পান। ফলে এই বাড়তি বেতন মালিকেরা শ্রমিকদের দিতে পারবেন কি না, সেটি আগে আলাপ করতে হবে। এমন আরও কিছু বিষয় রয়েছে।

কর্তৃপক্ষ বদল হলে আইনি কাঠামো কী হবে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্পসচিব ওবায়দুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, একীভূত হলে হয়তো নতুন আইনে এটি পরিচালনা করতে হবে। চামড়া শিল্পনগরীকে তখন বিশেষ ইপিজেড হিসেবে রাখা (ঘোষণা করা) হতে পারে।

.

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পুনরায় মূল্যায়ন শুরু করে তারা। বিএনপি সরকার গঠনের পরে চামড়া শিল্পনগরী বেপজার অধীন নেওয়ার বিষয়েও দুটি সভায় আলোচনা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, চামড়া শিল্পনগরী বেপজার অধীন নেওয়ার বিষয়ে বেশ কিছু কারিগরি জটিলতা রয়েছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এই জটিলতাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন। এই বিষয়গুলোর চূড়ান্ত ফয়সালার ওপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে।

জানতে চাইলে চামড়া শিল্পনগরীর কর্তৃপক্ষ বদলের বিষয়ে গঠিত কমিটির প্রধান ও বেজার সদস্য মো. নজরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও কর্তৃপক্ষ বদলের প্রক্রিয়াটি এখনো শুরু হয়নি। কারণ, এর চেয়েও ফলপ্রসূ কোনো বিকল্প আছে কি না, তা নিয়ে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।’

বর্তমানে তারা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অংশীজন ও সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করছেন বলে জানান নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। প্রতিনিধিদলটি ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনও করেছে।

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো দূষণ নিয়ে চামড়া খাতে যে সংকট রয়েছে, তার থেকে স্থায়ী পরিত্রাণ পাওয়া। এটি কি শেষ পর্যন্ত বেপজার অধীনে যাবে, নাকি কোনো বিদেশি বিনিয়োগ সংস্থা এখানে সরাসরি যুক্ত হবে, তা নানা বিষয় পর্যালোচনার পরে নির্ধারিত হবে।’